রাজধানীর উত্তরা ও তুরাগ এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়া ও অর্থপাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ছয়জন চীনা নাগরিকসহ মোট নয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। অভিযান চলাকালে বিপুল পরিমাণ সিম কার্ড, উন্নত প্রযুক্তির যোগাযোগ সরঞ্জাম, নগদ অর্থ এবং বিভিন্ন ডিভাইস জব্দ করা হয়, যা একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্রের কার্যক্রমের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ডিবি সূত্রে জানা যায়, নিয়মিত সাইবার নজরদারির সময় ফেসবুক, ইউটিউব, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুয়া ওয়েবসাইটে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা হয়। সেখানে স্বল্প সময়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা হতো। পরবর্তীতে মোবাইল ব্যাংকিং ও অন্যান্য অবৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করে তা বিদেশে পাচার করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত বুধবার সকালে উত্তরা পশ্চিম থানার ১৩ নম্বর সেক্টর এবং তুরাগ থানার রূপায়ণ হাউজিং এস্টেট এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো হয়। উত্তরা থেকে তিনজন স্থানীয় সহযোগী এবং তুরাগ থেকে ছয়জন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে অত্যাধুনিক জিএসএম গেটওয়ে মেশিন, শত শত সিম কার্ড, স্মার্টফোন, ল্যাপটপ এবং বিপুল নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) জানান, এই চক্রটি অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে কাজ করছিল। তারা অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করত এবং বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের মানুষকে টার্গেট করত। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, অর্জিত অর্থের বড় অংশ বিদেশে, বিশেষ করে চীনে পাচার করা হতো।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রমনা থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনের অধীনে দায়ের করা একটি মামলায় দেখানো হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই চক্রের পেছনে আরও বড় নেটওয়ার্ক থাকতে পারে, যা শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
গ্রেপ্তারদের তথ্য তালিকা
| ক্রমিক | নাম | বয়স | পরিচয় | গ্রেপ্তার স্থান |
|---|---|---|---|---|
| ১ | এম এ জি | ৩৩ | স্থানীয় সহযোগী | উত্তরা |
| ২ | মোহাম্মদ কাউসার হোসেন | ২৪ | স্থানীয় সহযোগী | উত্তরা |
| ৩ | মোহাম্মদ আবদুল করিম | ২৮ | স্থানীয় সহযোগী | উত্তরা |
| ৪ | রোকন উদ্দিন | ৪০ | স্থানীয় সহযোগী | উত্তরা |
| ৫ | ঝাং জিয়াহাও | ২২ | বিদেশি নাগরিক | তুরাগ |
| ৬ | লিও জিনজি | ৩২ | বিদেশি নাগরিক | তুরাগ |
| ৭ | ওয়াং শিবো | ২৪ | বিদেশি নাগরিক | তুরাগ |
| ৮ | চাং তিয়ানতিয়ান | ২৯ | বিদেশি নাগরিক | তুরাগ |
| ৯ | জেমস ঝু | ৪৩ | বিদেশি নাগরিক | তুরাগ |
অভিযানে উদ্ধার করা সরঞ্জামের মধ্যে ছিল ৬৪-পোর্টের তিনটি জিএসএম গেটওয়ে মেশিন, একটি ৮-পোর্ট ও একটি ২৫৬-পোর্ট মডিউল, প্রায় ২৮০টি বিভিন্ন অপারেটরের সিম কার্ড, ২০টি স্মার্টফোন, একাধিক ল্যাপটপ, প্রায় ৬ লাখ ৫ হাজার টাকা নগদ অর্থ, বিদেশি নাগরিকদের পাসপোর্ট ও পরিচয়পত্র এবং একটি মাইক্রোবাস।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এই ধরনের গেটওয়ে ডিভাইস ব্যবহার করে ভিওআইপি ও ভার্চুয়াল কল রাউটিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। এতে কলের উৎস গোপন রেখে বিদেশে অবৈধ যোগাযোগ ও আর্থিক লেনদেন সহজ করা যায়।
ডিবি কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই চক্র শুধু অনলাইন জুয়া নয়, বরং একটি বিস্তৃত সাইবার অপরাধ নেটওয়ার্কের অংশ হতে পারে, যেখানে অর্থপাচার, প্রতারণা এবং অবৈধ যোগাযোগ ব্যবস্থা একসঙ্গে পরিচালিত হচ্ছিল। তদন্ত শেষে পুরো চক্রের নেটওয়ার্ক উদঘাটনের আশা করা হচ্ছে।
