চট্টগ্রামের ১৬টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী দামামা বাজলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনে ধীরগতি এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ফোর্সের অনুপস্থিতি সাধারণ ভোটারদের মনে শঙ্কা জাগিয়ে তুলছে। ১ হাজার ৯৬৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা আসন্ন নির্বাচনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে তোলে।
কেন্দ্র বিন্যাস ও ঝুঁকির পরিসংখ্যান
নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের কেন্দ্রগুলোকে ভৌগোলিক অবস্থান, প্রার্থীর প্রভাব এবং অতীতের সংঘাতের ইতিহাসের ভিত্তিতে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। নিচে চট্টগ্রামের ভোটকেন্দ্রের ঝুঁকির একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:
| ক্যাটাগরি | কেন্দ্রের সংখ্যা ও বিবরণ |
| মোট ভোটকেন্দ্র | ১,৯৬৫টি (চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে) |
| ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র (মোট) | ১,২৯১টি |
| নগর এলাকার অতিঝুঁকিপূর্ণ | ৩১২টি (মেট্রোপলিটন এলাকা) |
| জেলার ১৩ আসনে অতিঝুঁকিপূর্ণ | ৩৪৪টি |
| নিরাপত্তা ব্যবস্থা | ৯৯৯টি সিসিটিভি ক্যামেরা (পুলিশের তথ্যানুযায়ী) |
মাঠপর্যায়ের চিত্র: প্রস্তুতির বেহাল দশা
সরেজমিনে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা ও নগরীর কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখা গেছে মিশ্র চিত্র। কোথাও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি থাকলেও অবকাঠামো জরাজীর্ণ, আবার কোথাও সিসিটিভি ক্যামেরা বা বুথ স্থাপনের কাজই শুরু হয়নি।
১. নগর এলাকা (চট্টগ্রাম-১০ আসন): আরাকান হাউজিং সোসাইটির মডার্ন আইডিয়াল স্কুল কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৩৪৯ জন। এটি একটি পুরুষ কেন্দ্র হলেও এর যাতায়াত পথ অত্যন্ত সরু, যা জরুরি অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রবেশের জন্য অনুপযুক্ত। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে সিসিটিভি লাগানো হলেও কেন্দ্রটির সামগ্রিক পরিবেশ ভোটগ্রহণের জন্য পর্যাপ্ত নয়।
২. লোহাগাড়া ও আনোয়ারার উপকূলীয় শঙ্কা: লোহাগাড়ার তৈয়ব আশরাফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে কেন্দ্র দখলের রেকর্ড থাকলেও সেখানে প্রস্তুতির বালাই নেই। এমনকি কাপড় দিয়ে ঘিরে বুথ তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যা গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ। অন্যদিকে, আনোয়ারার দক্ষিণ গহিরা ও জুঁইদণ্ডী এলাকা অত্যন্ত দুর্গম। অতীতে ব্যালট বাক্স পোড়ানোর ঘটনা ঘটলেও সেখানে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক উপস্থিতির অভাব লক্ষ্য করা গেছে।
৩. সন্দ্বীপ ও মিরসরাই: সন্দ্বীপের ৮৩টি কেন্দ্রের মধ্যে ২৪টি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। মগধরা ইউনিয়নে সিসিটিভি থাকলেও বিকেলের দিকে কোনো নিরাপত্তারক্ষীকে দেখা যায়নি। মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া যাহেদিয়া দাখিল মাদ্রাসার কেন্দ্রে বিএনপির রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সেটিকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। তবে নির্বাচনের পূর্বমুহূর্তে সেখানে এখনো বুথ সাজানোর প্রাথমিক কাজ চলছে।
প্রশাসনের বক্তব্য ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাসেল জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর জন্য নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত ফোর্সের পাশাপাশি পুলিশের বিশেষ নজরদারি থাকবে। সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহিনুল ইসলামের মতে, সীতাকুণ্ডের ১০৮টি কেন্দ্রের প্রতিটিই গুরুত্বপূর্ণ এবং এর মধ্যে ৪৮টি কেন্দ্রকে রাখা হয়েছে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ তালিকায়।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ভোটকেন্দ্রের অবস্থান, প্রার্থীর বাসভবন থেকে দূরত্ব এবং গোলযোগের আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে যে ‘সাধারণ’ ও ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে, সে অনুযায়ী দ্রুত সময়ের মধ্যে সকল ত্রুটি সংশোধন করে একটি সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায়, ভোটার উপস্থিতি এবং নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।
