খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুন ২০২৬, ১২:৩০ এএম

আসন্ন অক্টোবর মাসে ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকার যে রাজনৈতিক আশা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এতদিন ধরে পোষণ করে আসছিলেন, তা ইতিমধ্যেই বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে সম্পাদিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি তাঁর সেই পূর্বপরিকল্পিত রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও বেশি জটিল, অস্থিতিশীল ও গভীর সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। এই চুক্তির ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
Table of Contents
ইরান যুদ্ধে ইসরায়েলের কৌশলগত লক্ষ্যগুলো পুরোপুরি অর্জিত হওয়ার অনেক আগেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান ও লেবাননে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করার আকস্মিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এর ফলে বিগত মার্চ মাসে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দেওয়া সেই বহুল আলোচিত এবং কট্টরপন্থী বক্তব্য—”আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিচ্ছি”—এখন অনেকটাই ফাঁকা বুলিতে পরিণত হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। যুদ্ধ বন্ধের এই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত নেতানিয়াহুর সামরিক ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতাকে খোদ ইসরায়েলের অভ্যন্তরেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়করিয়েছে।
এ ছাড়া, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তীব্র বিতর্ক এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের আকস্মিক ও নজিরবিহীন হামলার আগাম নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যর্থতা নিয়ে ৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু ইতিমধ্যেই চরমভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। এর ওপর এখন নতুন করে যোগ হয়েছে যুদ্ধ পরিচালনায় তাঁর চরম অদূরদর্শিতা এবং ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য কৌশলগত মিত্র রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ইসরায়েলি ভোটাররা মূলত এই সুনির্দিষ্ট বিষয়গুলো এবং সামরিক ব্যর্থতা বিবেচনায় নিয়েই তাঁর রাজনৈতিক ভাগ্য নির্ধারণ করবেন।
যদিও বর্তমান সময়ের সমস্ত জনমত জরিপে স্পষ্ট আভাস পাওয়া যাচ্ছে যে, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী রাজনৈতিক জোট এবার নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হতে চলেছে; তবুও ১৯৯০-এর দশক থেকে ইসরায়েলি সংসদীয় রাজনীতিতে একক আধিপত্য বিস্তার করা এই ঝানু ও চতুর রাজনৈতিক নেতাকে এখনই রাজনৈতিক ময়দান থেকে একদম উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিজস্ব রাজনৈতিক দল ‘লিকুদ পার্টি’ সর্বদা তাঁকে একজন আপসহীন ও কট্টরপন্থী ‘নিরাপত্তা রক্ষক’ হিসেবে দেশবাসীর কাছে চিত্রিত করে থাকে। তিনি বরাবরই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের তীব্র বিরোধিতা করে এসেছেন এবং ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনার ওপর সরাসরি সামরিক হামলার পক্ষে সর্বদা অনড় অবস্থান প্রদর্শন করেছেন। এমনকি ২০❺ সালেও তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, জردান নদীর পশ্চিমাঞ্চলে তিনি কোনো অবস্থাতেই স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠিত হতে দেবেন না।
কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামাসের হামলার পূর্বে ইসরায়েলি সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা সংস্থার নজিরবিহীন ব্যর্থতা এবং পরবর্তীতে গাজা উপত্যকা ও লেবাননে কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি সত্ত্বেও কোনো চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া তাঁর সেই কট্টর ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করেছে। একই সাথে বিগত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ইসরায়েলি সেনার প্রাণহানির পরও কোনো স্থায়ী বা চূড়ান্ত বিজয় না আসায় ইসরায়েলি সমাজে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। অধিকাংশ ইসরায়েলি নাগরিক নীতিগতভাবে যুদ্ধের পক্ষে অবস্থান করলেও, তাঁরা বর্তমানে নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল এবং उद्देश्यহীন সামরিক অভিযানের তীব্র বিরুদ্ধে চলে গেছেন।
হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ড ইসরায়েলের অভ্যন্তরে ব্যাপকভাবে উদ্যাপন করা হলেও, বর্তমান বাস্তব চিত্র হলো হামাস এখনো গাজা উপত্যকার একটি বড় অংশ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে এবং হিজবুল্লাহ সামরিকভাবে লেবাননের মাটিতে শক্ত অবস্থানে টিকে রয়েছে। ট্রাম্পের এই চুক্তির পর ইসরায়েলের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ নেতানিয়াহুর ওপর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘নেতানিয়াহু এই যুদ্ধে স্পষ্টভাবে হেরে গেছেন। দেশের জনগণকে তিনি যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা শেষ পর্যন্ত দিতে পারেননি; সত্যের মুখোমুখি হওয়ার চূড়ান্ত মুহূর্তে তিনি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছেন।’
এদিকে গাজা উপত্যকায় দীর্ঘ সময় ধরে চলা নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ এবং ব্যাপক প্রাণহানির কারণে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক গণহত্যার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এর পরিপ্রক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে।
বিভিন্ন সময়ে পাশ্চাত্যের জোরালো কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করলেও খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্টদের সঙ্গেই নেতানিয়াহু বারবার বৈরী ও তিক্ত সম্পর্ক তৈরি করেছেন। এক প্রখ্যাত জীবনীকারের প্রকাশিত তথ্যমতে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ব্যক্তিগত এক আলাপচারিতায় ক্ষুব্ধ হয়ে নেতানিয়াহুকে ‘সন অব আ বিচ’ বলে গালি দিয়েছিলেন। এমনকি মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পও গত জুন মাসে এক দ্বিপাক্ষিক ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলে আখ্যায়িত করেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় রাজনৈতিক দলের সাধারণ ভোটারদের মধ্যেই ইসরায়েলের প্রতি ঢালাও সমর্থন ও সহানুভূতির হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
১৯৭৬ সালে উগান্ডার এন্টেবে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিলিস্তিনি গেরিলাদের দ্বারা অপহৃত বিমানযাত্রীদের উদ্ধার অভিযানে গিয়ে নিহত হন নেতানিয়াহুর আপন বড় ভাই ইয়োনি নেতানিয়াহু। মূলত এই ভাইয়ের মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে ধারণ করে সরাসরি রাজনীতিতে আগমন ঘটে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে ইসরায়েলের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কট্টরপন্থী, উগ্র-জাতীয়তাবাদী ও উগ্র-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোকে সাথে নিয়ে প্রথমবারের মতো একটি জটিল জোট সরকার গঠন করেন তিনি।
বিবিধ আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির মামলা মাথায় নিয়েই ২০২২ সালে তিনি ষষ্ঠবারের মতো পুনরায় ইসরায়েলের রাষ্ট্রক্ষমতায় সমাসীন হন। ক্ষমতায় এসেই তিনি দেশটির বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করতে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার বিতর্কিত আইনি উদ্যোগ নেন, যা ২০২৩ সালে সমগ্র ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘস্থায়ী গণ-বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
নেতানিয়াহু মূলত ২০২০ সালের ঐতিহাসিক ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ বা আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ও অধিকার প্রদান না করেই সমগ্র আরব বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি নিজের এক গৌরবময় ঐতিহাসিক লিগ্যাসি বা রাজনৈতিক অধ্যায় তৈরি করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের হামাসের অতর্কিত সামরিক হামলা এবং তার পরবর্তী রক্তক্ষয়ী গাজা যুদ্ধ তাঁর সেই সুদূরপ্রসারী ভূ-রাজনৈতিক পরিকল্পনাকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। বর্তমান পশ্চিমা বিশ্বে ইসরায়েলের नैतिक ও কূটনৈতিক অবস্থান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও কলঙ্কিত হয়েছে, যার ফলে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান অত্যন্ত তিক্ত, ব্যর্থ এবং চরম বিতর্কিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে হতে চলেছে।
| তথ্যের ক্যাটাগরি | সুনির্দিষ্ট ও যাচাইকৃত রাজনৈতিক বিবরণ |
| প্রধান চরিত্র | বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, প্রধানমন্ত্রী, ইসরায়েল (বয়স ৭৬ বছর) |
| রাজনৈতিক দল | লিকুদ পার্টি (ডানপন্থী রাজনৈতিক জোট) |
| নির্বাচনের সময় | চলতি বছরের অক্টোবর মাস |
| আন্তর্জাতিক চুক্তি | সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি চুক্তি (প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্যোগ) |
| অভ্যন্তরীণ সংকট | দুর্নীতি মামলা, ৭ অক্টোবরের গোয়েন্দা ব্যর্থতা, বিচার বিভাগীয় বিতর্ক |
| আন্তর্জাতিক আইনি অবস্থা | আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি |
| ঐতিহাসিক উদ্যোগ | ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস (আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ) |
| প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ | ইয়ার লাপিদ (ইসরায়েলের বর্তমান বিরোধী দলীয় নেতা) |
মন্তব্য