আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাম্প্রতিক আর্থিক পূর্বাভাসে দেশের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় মিশ্র চিত্র উঠে এসেছে। একদিকে রাজস্ব আয়ের ধীরে ধীরে উন্নতির সম্ভাবনা দেখা গেলেও অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি ও সরকারি ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধির প্রবণতা অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে রাজস্ব আয় কিছুটা বাড়লেও একই সময়ে সরকারি ব্যয় ও ঘাটতির চাপও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি ব্যয়ের কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। সামাজিক সুরক্ষা ও জনকল্যাণমূলক ব্যয় গত অর্থবছরে কিছুটা কমলেও চলতি অর্থবছরে তা পুনরায় বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি সরকারের আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের উত্তেজনা, আমদানি ব্যয়কে আরও অস্থির করে তুলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর ফলে ভর্তুকি ব্যয়ও বাড়তে পারে, যদি বাজারমূল্যের সঙ্গে দেশীয় সমন্বয় যথাযথভাবে না করা হয়।
অন্যদিকে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে ধীর কিন্তু স্থিতিশীল বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের হার স্থিতিশীল থাকলেও চলতি অর্থবছরে তা কিছুটা উন্নতির দিকে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এই অগ্রগতি টেকসই করতে হলে কর প্রশাসন শক্তিশালী করা, কর ফাঁকি রোধ করা এবং রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার অব্যাহত রাখা প্রয়োজন বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হিসেবে বাজেট ঘাটতির ধারাবাহিক বৃদ্ধি তুলে ধরা হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘাটতির হার ক্রমাগত বেড়ে চলেছে এবং আগামী বছরগুলোতে তা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে সরকারের ঋণ গ্রহণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগের গতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে আগের ঋণ পরিশোধের চাপও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার বড় অংশ নতুন ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে হচ্ছে।
সরকারি ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে কাঙ্ক্ষিত বিনিয়োগ না বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে অবকাঠামো ও চলমান প্রকল্পে ব্যয় বাড়লেও তা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল নিশ্চিত করতে পারছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সামগ্রিক প্রবণতা নিচের সারণিতে উপস্থাপন করা হলো—
| সূচক | ২০২৩-২৪ অর্থবছর | গত অর্থবছর | চলতি অর্থবছর (পূর্বাভাস) | আগামী অর্থবছর (পূর্বাভাস) |
|---|---|---|---|---|
| বাজেট ঘাটতি (মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে) | ৩.৭ | ৩.৮ | ৩.৯ | ৪.৫ |
| রাজস্ব আয় (মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে) | ৭.৭ | ৭.৭ | ৮.৯ | ৯.১ |
| সরকারি ব্যয় (মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাতে) | ১১.৪ | ১১.৪ | ১২.৯ | ১৩.৬ |
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়তে পারে এবং কর্মসংস্থান সম্প্রসারণের পাশাপাশি রাজস্ব আহরণও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ব্যয় ব্যবস্থাপনায় কঠোর শৃঙ্খলা, রাজস্ব সংস্কারের ধারাবাহিকতা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনের সারকথা হলো, রাজস্ব আয়ের সম্ভাব্য উন্নতি সত্ত্বেও যদি ব্যয় ও ঋণনির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
