খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ই মে ২০২৬, ৩:৪৪ পিএম

আমরা জানি, নিয়মিত শরীরচর্চা না করা, মোবাইল ফোনে আসক্তি, অলসতা, তামাক বা এলকোহল সেবন ইত্যাদি আমাদের ব্যক্তিজীবন, পরিবার তথা সমাজের জন্য অকল্যাণকর।
কিন্তু জীবনে কত শত কসম বা প্রতিজ্ঞার পরও এসব বদঅভ্যাস থেকে আমাদের মুক্তি মিলে না?
কেন?
এই কেন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের আজকের প্রয়াস।
মূলত: আমাদের মন তথা মস্তিষ্কে একটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়! শয়তান বনাম ফেরেশতা। দুটোর অবস্থানই আমাদের মস্তিষ্কের ভিতরের শক্তি।
আমাদের পক্ষে যে যুদ্ধ করে তার নাম: “Prefrontal Cortex” (প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স) বা মস্তিষ্কের সম্মুখভাগ; আর বিপক্ষ তথা বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করে তথা বদ অভ্যাসে আমাদেরকে আসক্ত করে, তা হলো আমাদের মস্তিষ্কের আদিম অংশ (Limbic System) যা আমাদের তাৎক্ষণিক আনন্দ বা সুখ দিতে ডোপামিন নিঃস্বরণ করে।
আজকের আলোচনা মূলত: প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে নিয়ে। ইহা শক্তিশালী ও কার্যকর থাকলেই সব বদঅভ্যাস পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। ফলে মানুষ সফলতার স্বর্ন শিখরে পৌছাতে পারে।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে আমাদের মস্তিষ্কের “চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার” (CEO) বলতে পারেন। এটি আমাদের চিন্তা-ভাবনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের মূল চালিকাশক্তি।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স-এর প্রধান কাজসমূহ:
* সিদ্ধান্ত গ্রহণ (Decision Making): ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্য এবং কাজের দূরবর্তী ফলাফল বিশ্লেষণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের এটি সাহায্য করে।
* পরিকল্পনা ও লক্ষ্য নির্ধারণ (Planning & Goal Setting): এটা ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করা এবং সেই লক্ষ্য অর্জনের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করে।
* আবেগ নিয়ন্ত্রণ (Emotional Regulation): ইহা রাগ, ভয় বা তাৎক্ষণিক উত্তেজনাকে প্রশমিত করে পরিস্থিতি অনুযায়ী যুক্তিযুক্ত আচরণ করতে সাহায্য করে।
* মনোযোগ ধরে রাখা (Focus & Attention): কোনো নির্দিষ্ট কাজে মনোযোগ ধরে রাখা এবং আশেপাশের মনোযোগ বিঘ্নকারী বিষয় (Distractions) থেকে মনকে দূরে রাখার কাজটি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সই করে।
কিভাবে এটি আমাদের ইচ্ছাশক্তি (Willpower) বৃদ্ধি করে?
মনোবিজ্ঞানী এবং স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে, ইচ্ছাশক্তি কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়, এটি সরাসরি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। ইচ্ছাশক্তি বা ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ’ (Self-control) বজায় রাখতে এই কর্টেক্স মূলত: তিনটি ভিন্ন উপায়ে কাজ করে:
ক) “আমি করব না” শক্তি (I Won’t Power):
যখন আপনার সামনে কোনো প্রলোভন আসে—যেমন:
১। ডায়েট করার সময় মিষ্টি খাওয়া;
২। পরীক্ষার আগে সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করা; ইত্যাদি
—তখন মস্তিষ্কের আদিম অংশ (Limbic System) তাৎক্ষণিক আনন্দের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে এবং ডোপামিন নিঃস্বরণ করে। এই ডোপামিনের সামনে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স তখন বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটি আপনাকে মনে করিয়ে দেয়, “না, এই কাজটি এখন করা যাবে না। ভবিষ্যত সমৃদ্ধির জন্য আপনার একটি সঠিক পরিকল্পনা আছে, যা আপনাকে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।
খ) “আমি করব” শক্তি (I Will Power):
সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্যায়াম করা বা কঠিন কোনো অ্যাসাইনমেন্ট শেষ করতে অলসতা বা অনিচ্ছা আমাদের টুটি চেপে ধরে। সেখানেও মস্তিষ্কের আদিম অংশ প্ররোচিত করে যে, একদিন ব্যয়াম না করলে অসুবিধা হবে না, আজ আরেকটু ঘুমিয়ে নেন। আর তখনই প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স সেই জড়তা কাটিয়ে উঠে কাজটি শুরু করতে আপনাকে শক্তি জোগায়।
গ) “আমি চাই” শক্তি (I Want Power):
এটি হলো আপনার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য বা জীবনের আসল উদ্দেশ্য মনে রাখার ক্ষমতা। আপনি ভবিষ্যতে কী অর্জন করতে চান (যেমন: ক্যারিয়ারে সফল হওয়া বা সুস্থ থাকা, ইত্যাদি)। সেই লক্ষ্যটিকে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আপনার স্মৃতির মণিকোঠায় ধরে রাখে। যখনই আপনার ইচ্ছাশক্তি কমতে শুরু করে, এই অংশটি আপনাকে মনে করিয়ে দেয় যে আপনার সামনে অপার সম্ভাবনা। এজন্য একটু কষ্ট করতে হবে। কষ্টের ফল খুবই সুমিষ্ট হয়।
এখানে প্রশ্ন হলো, বিড়ি খাওয়া, অলসতা বা সারারাত মোবাইল ফোনে আসক্তি ইত্যাদি অত্যন্ত খারাপ অভ্যাস; তবুও নেশার মতো বোধ হয়ে থাকি মূলত: আমাদের প্রিয় বন্ধু প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বা ইচ্ছাশক্তি যুদ্ধে পরাজিত হয় বলে।
কেন সে পরাজিত হয়? দুর্বল সৈনিক যুদ্ধে পরাজিত হবে, এটা স্বাভাবিক। অর্থাৎ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বা ইচ্ছাশক্তি যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখন ডোপামিনের কাছে তার পরাজয় আমাদের বদ অভ্যাসে নিমজ্জিত করে।
ইচ্ছাশক্তি ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে শক্তিশালী করার উপায়:
ইচ্ছাশক্তি অনেকটা শরীরের পেশির (Muscle) মতো। অবহেলা করলে এটি দুর্বল হয়ে পড়ে, আবার সঠিক চর্চায় এটিকে আরও শক্তিশালী করা যায়।
1. পর্যাপ্ত ঘুম: ঘুম কম হলে প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে রক্ত সঞ্চালন ও শক্তির সরবরাহ কমে যায়, যার ফলে আমরা সহজেই প্রলোভনের কাছে হেরে যাই এবং আমাদের ইচ্ছাশক্তি কমে যায়। তাই দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম জরুরি।
2. ধ্যান বা মেডিটেশন (Meditation): নিয়মিত মাত্র কয়েক মিনিটের ধ্যান প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে ধূসর পদার্থের (Gray Matter) ঘনত্ব বাড়ায়, যা মনোযোগ এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা অলৌকিকভাবে বাড়িয়ে দেয়।
3. ধীরস্থির শ্বাস-প্রশ্বাস (Deep Breathing): যখনই কোনো প্রলোভনে পড়বেন, তখন বুক ভরে গভীর শ্বাস নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এটি আপনার স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে পুনরায় সচল করে তোলবে।
4. ছোট ছোট লক্ষ্য নির্ধারণ: একবারে বড় পরিবর্তনের চেষ্টা না করে ছোট ছোট লক্ষ্য জয় করার মাধ্যমে এই কর্টেক্সের কার্যক্ষমতা তথা ইচ্ছাশক্তি ধীরে ধীরে বাড়ানো যায়।
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (PFC) বা ইচ্ছাশক্তিকে শক্তিশালী করতে স্নায়ুবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদগণ আরও কিছু চমৎকার এবং কার্যকরী কিছু উপায় সাজেস্ট করেন। সেগুলো হলো:
১. পুষ্টিকর খাবার ও ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (Brain Food):
মস্তিষ্কের এই অংশটি অত্যন্ত বেশি পরিমাণে শক্তি-ক্ষয় করে। তাই একে সচল রাখতে সঠিক ও পর্যাপ্ত জ্বালানির প্রয়োজন।
* ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: সামুদ্রিক মাছ, আখরোট, তিসির তেল বা চিয়া সিড প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের কার্যক্ষমতা বাড়াতে সরাসরি সাহায্য করে;
* লো-গ্লাইসেমিক খাবার: শাকসবজি, ওটস, বাদাম এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফল (যেমন- বেরি বা বেদানা) মস্তিষ্কে গ্লুকোজের মাত্রা স্থিতিশীল রাখে, যা হুট করে ইচ্ছাশক্তি কমে যাওয়া (Decision Fatigue) রোধ করে।
২. শারীরিক ব্যায়াম:
ব্যায়াম শুধু শরীরের পেশি নয়, মস্তিষ্কের পেশি বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটা, দৌড়ানো বা সাঁতার কাটার ফলে মস্তিষ্কে BDNF (Brain-Derived Neurotrophic Factor) নামক একটি প্রোটিন নিঃসৃত হয়। এটি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সে নতুন নিউরন তৈরিতে এবং এর কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরাসরি ভূমিকা রাখে।
৩. ডোপামিন ডিটক্স (Dopamine Detox)
স্মার্টফোনের নোটিফিকেশন, সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোলিং বা রিলস বা শর্টস ভিডিও দেখার অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক ডোপামিন (Instant Gratification) তৈরি করে। এটি প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে অলস ও দুর্বল করে দেয়। তাই ডোপামিন ডিটক্স করতে:
* প্রতিদিন অন্তত ১-২ ঘণ্টা সব ধরনের স্ক্রিন থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করুন;
* কাজ বা বই পড়ার সময় ফোনটি অন্য ঘরে বা চোখের আড়ালে রাখুন।
৪. মস্তিষ্কের ট্রেনিং (Cognitive Challenges)
পেশির মতো প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকেও চ্যালেঞ্জের মুখে রাখলে এটি শক্তিশালী হয়। যেমন:
* নতুন ভাষা শেখা;
* পাজল ও কৌশলগত খেলা যেমন: দাবা খেলা, পাজল মেলানো;
• জটিল কোনো বই পড়া এবং তা বোঝার চেষ্টা করা ইত্যাদি।
৫. মানসিক চাপ (Stress Management)
ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের সবচেয়ে বড় শত্রু। প্রচণ্ড স্ট্রেসের সময় আমাদের মস্তিষ্ক ‘সারভাইভাল মোডে’ চলে যায়, ফলে যুক্তি ও ইচ্ছাশক্তির কেন্দ্রটি সাময়িকভাবে সাটডাউন বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়।
* স্ট্রেস কমাতে প্রতিদিন কিছু সময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো বা পছন্দের কোনো শখ (যেমন- বাগান করা, ডায়েরি লেখা) চর্চা করা উচিত।
৬. ‘If-Then’ পরিকল্পনা:
ইচ্ছাশক্তিকে স্বয়ংক্রিয় করার এটি একটি দারুণ মনস্তাত্ত্বিক কৌশল। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখুন যে কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে আপনি কী করবেন।
যেমন: “যদি (If) বিকেল ৫ টায় আমার অলসতা লাগে, তবে (Then) আমি ৫ মিনিটের জন্য হাঁটতে বের হব।”
উপসংহার: প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স একটি ব্যাটারির মতো। ভালো খাবার, ঘুম ও ব্যায়াম দিয়ে একে চার্জ করতে হয়; আর মেডিটেশন, ডোপামিন ডিটক্স এবং সুশৃঙ্খল জীবন যাপনের মাধ্যমে এর অপচয় রোধ করা যায়। যদি ইহা সক্রিয় থাকে তবে আমাদের অলসতা ও বদ অভ্যাসের বিরুদ্ধে জয় লাভ করা অধিকতর সহজ। আর তখন মানুষ হিসেবে আমাদের জনম সার্থক হবে এবং আমাদের জাতিকে নিয়ে প্রশংসার গান গাইবে বিশ্ববাসী।
লেখক: ক্লিন এন্ড গ্রিন ফাউন্ডেশন ও গরিব ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা। জি এম কিবরিয়া
মন্তব্য