জেরুজালেমের ঐতিহাসিক আল-আকসা মসজিদের ওপর জর্ডানের দীর্ঘদিনের প্রথাগত অভিভাবকত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বাতিলের একটি গভীর পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল যৌথভাবে এমন একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা নিয়ে কাজ করছে, যার মাধ্যমে আল-আকসা প্রাঙ্গণে জর্ডান-সমর্থিত ইসলামি ওয়াকফের বর্তমান একক কর্তৃত্ব সম্পূর্ণভাবে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। এই পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পবিত্র এই স্থানের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক এবং ধর্মীয় স্থিতাবস্থা মারাত্মক সংকটের মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, আল-আকসা মসজিদের বর্তমান ইসলামি প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে ইসরাইল সরকারের সরাসরি অধীনে নতুন একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান গঠন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এই প্রতিষ্ঠানটি আল-আকসাকে একটি ‘বহুধর্মীয় কেন্দ্র’ হিসেবে বিশ্ব দরবারে ঘোষণা করবে, যেখানে মুসলিমদের পাশাপাশি ইহুদি সম্প্রদায়ের লোকজনকে ‘সমান প্রবেশাধিকার’ এবং প্রার্থনার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে আল-আকসার ইমাম ও ধর্মীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রেও ইসরাইল সরকারের সরাসরি ভূমিকা থাকবে। এমনকি প্রতি সপ্তাহের জুমার নামাজের খুতবার মূল বিষয়বস্তুর ওপরও ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক করার ব্যবস্থা রাখা হতে পারে।
ইসলামি পরিচয় দুর্বল করার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া
ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সমালোচকদের মতে, এটি কেবল একটি সাধারণ প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়, বরং জেরুজালেমের ঐতিহ্যবাহী ইসলামি পরিচয়কে চিরতরে দুর্বল করার একটি সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার অংশ। তাদের দাবি, আল-আকসাকে একটি মুসলিম পবিত্র স্থান থেকে ধীরে ধীরে একটি সাধারণ পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরিত করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। ইসরাইলি মানবাধিকার ও পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘ইর আমিম’-এর ২০২৫ সালের একটি বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-আকসা প্রাঙ্গণে সাধারণ ফিলিস্তিনিদের প্রবেশাধিকার সংকুচিত করে ইহুদিদের প্রবেশের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। এসব অননুমোদিত প্রবেশের সময় ইসরাইলি পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী তাদের বিশেষ সুরক্ষা প্রদান করে থাকে। সংস্থাটির গবেষক আভিভ তাতারস্কি এই বিষয়ে বলেন, ‘ইহুদি ধর্মীয় সম্পর্কের আড়ালে ইসরাইল রাষ্ট্র মূলত ধীরে ধীরে পবিত্র এই স্থানের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।’
ফিলিস্তিনিদের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের পরিসংখ্যান
ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন প্রশাসনিক বিধিনিষেধ, নিষেধাজ্ঞা এবং আল-আকসা প্রাঙ্গণে ফিলিস্তিনিদের বর্তমান করুণ পরিস্থিতির একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র নিচে তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| নিষেধাজ্ঞার ধরন ও আক্রান্তের ক্ষেত্র | বর্তমান পরিসংখ্যান ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ |
| ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা | ৬০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি মুসলমানের ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা। |
| ইসলামি ওয়াকফ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর নিষেধাজ্ঞা | ওয়াকফের ৩০ জন নিয়মিত কর্মীর প্রবেশ অনুমতি সম্পূর্ণ বাতিল। |
| ধর্মীয় খতিব ও ইমামদের ওপর নিষেধাজ্ঞা | ৬ জন প্রবীণ ইমামকে জুমার খুতবা দেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে। |
| নামাজে অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের সংখ্যা | অতীতে লাখো মুসল্লি অংশ নিলেও বর্তমান বিধিনিষেধের কারণে তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে। |
| ভূমি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত ইসরাইলি আগ্রাসন | পুরোনো জেরুজালেমের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ ‘চেইন গেট’-এর আশপাশে ফিলিস্তিনি সম্পত্তি অধিগ্রহণ। |
ফিলিস্তিনি নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
আল-আকসা মসজিদের জ্যেষ্ঠ ইমাম ও প্রবীণ খতিব ইকরিমা সাবরি ইসরাইলের এই সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোকে ‘অভূতপূর্ব কর্মকাণ্ড’ বলে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করেছেন। তাঁর মতে, এই সমস্ত একতরফা পদক্ষেপের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো পবিত্র এই স্থানে ইসরাইলের একচ্ছত্র আধিপত্য ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করা। গত মাসে ইসরাইলি সরকারের মন্ত্রী এবং পার্লামেন্ট সদস্যদের একটি দল আল-আকসা প্রাঙ্গণে জোরপূর্বক প্রবেশ করলে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। সেই সময় একজন উগ্র ইসরাইলি আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে আল-আকসা মসজিদ ভেঙে ফেলে সেখানে একটি ইহুদি মন্দির নির্মাণেরও আহ্বান জানান, যা মুসলিম বিশ্বের অনুভূতিতে বড় আঘাত হেনেছে। একই সময়ে পুরোনো জেরুজালেমের চেইন গেটের আশপাশে ফিলিস্তিনিদের পৈতৃক সম্পত্তি ও জমি জোরপূর্বক অধিগ্রহণের আইনি কার্যক্রমও দ্রুত গতিতে এগিয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আল-আকসা কেবল একটি সাধারণ ধর্মীয় স্থাপনা বা প্রাচীন ইমারত নয়, এটি সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ। তাই এর প্রশাসনিক কাঠামো এবং ঐতিহাসিক ধর্মীয় অবস্থান পরিবর্তনের যেকোনো ধরনের একতরফা উদ্যোগ মধ্যপ্রাচ্যসহ সমগ্র বিশ্বজুড়ে নতুন করে ভয়াবহ উত্তেজনা ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণ হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আল-আকসা ঘিরে চলমান এই সমস্ত ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও গভীর মনোযোগ ও দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করে। আন্তর্জাতিক মহলের বর্তমান নীরবতা এই পরিস্থিতিকে দিন দিন আরও জটিল ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে।
