আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই–আগস্ট মাসের ঘটনাসংক্রান্ত একাধিক মামলার বিচার কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর মধ্যে জাসদ সভাপতি ও প্রবীণ রাজনীতিক হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার শুনানি শেষ হয়েছে এবং বর্তমানে মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। অভিযোগপক্ষ ও প্রতিরক্ষা পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর বিচারিক প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে রয়েছে। আসামি বর্তমানে কারাবন্দী অবস্থায় আছেন।
মামলার কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিরক্ষা পক্ষের আইনজীবীদের দাবি অনুযায়ী, বিচারপ্রক্রিয়ার সময়কাল ও শুনানির সুযোগ নিয়ে কিছু প্রক্রিয়াগত প্রশ্ন উঠেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যায়নি এবং কিছু ক্ষেত্রে শুনানি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। একই সঙ্গে আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হয়নি বলেও তারা দাবি করেছেন। তবে এসব দাবি আদালতে পৃথকভাবে মূল্যায়নাধীন রয়েছে।
অভিযোগপক্ষ ও প্রতিরক্ষা পক্ষের উপস্থাপনার ভিত্তিতে মামলাটি বর্তমানে বিচারিক রায়ের অপেক্ষায় আছে। মামলার শুনানি শুরু হয় ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে এবং পরবর্তী ধাপে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তিতর্ক পর্ব সম্পন্ন হয়। অভিযোগপক্ষ ও আসামিপক্ষের বক্তব্য উপস্থাপনের পর বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়।
বিচারিক সময়সূচি ও ধাপসমূহ
| ধাপ | সময়কাল | বিবরণ |
|---|---|---|
| সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু | ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর | সাক্ষ্য উপস্থাপন শুরু হয় |
| জেরা ও সাক্ষ্য পর্ব | ২০২৫ সালের নভেম্বর–২০২৬ সালের শুরু | প্রতিরক্ষা পক্ষ সময়সীমা নিয়ে প্রশ্ন তোলে |
| যুক্তিতর্ক শুরু | ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল | উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু |
| যুক্তিতর্ক শেষ | ৯ কার্যদিবসের মধ্যে | সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সমাপ্ত |
| বর্তমান অবস্থা | রায় অপেক্ষমাণ | বিচারিক সিদ্ধান্তের পর্যায়ে |
আইনজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, এই মামলার বিচারিক সময়কাল পূর্ববর্তী কিছু মামলার তুলনায় কম। তারা বিভিন্ন ঐতিহাসিক মামলার দীর্ঘ শুনানির সঙ্গে তুলনা করে সময় ব্যবস্থাপনা ও প্রক্রিয়ার ভিন্নতা উল্লেখ করেছেন। তবে সরকারপক্ষের অবস্থান অনুযায়ী, শুনানির সময় নির্ধারণ ও পরিচালনা আদালতের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত বিষয় এবং এটি বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।
ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও মামলার পরিধি নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ে মতভেদ দেখা গেছে। একাংশ আইনজ্ঞের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাগুলো সাধারণ ফৌজদারি আদালতের আওতায় বিচারযোগ্য হতে পারে। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান হলো, নির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর আওতায় এসব বিষয় ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন করা হয়েছে।
ঘটনাসংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কিছু প্রতিবেদনে পৃথক পৃথক সময়সীমায় মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্যের পদ্ধতিগত যাচাই নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে বলে জানা যায়।
ফরেনসিক ও তদন্ত সংক্রান্ত বিষয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আইনজীবীদের একটি অংশ অস্ত্র ও গুলির ধরন, এবং সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তবে এসব বিষয়ে পৃথক তদন্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে একক ও চূড়ান্ত তথ্য এখনো স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়নি।
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় হলো—কোনো ঘটনার বিষয়ে অবগত থাকা এবং তা প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়া ফৌজদারি দায় সৃষ্টি করে কি না। আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আইনের সাধারণ নীতিমালায় বলা হয়, শুধুমাত্র অবগত থাকা এককভাবে অপরাধ প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়; নিয়ন্ত্রণ, নির্দেশনা ও কার্যকর ভূমিকার বিষয়ও বিবেচনায় আসে।
প্রতিরক্ষা পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসানুল হক ইনু ঘটনার সময় প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন না এবং সরাসরি নির্দেশ প্রদান বা নিয়ন্ত্রণের প্রমাণও উপস্থাপিত হয়নি। এছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন সংক্রান্ত সুযোগ নিয়ে তারা আপত্তি তুলেছেন।
বর্তমানে মামলাটি বিচারিক রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রমাণের মূল্যায়ন এবং প্রক্রিয়াগত সমতা—এই বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ রায় ও তার গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
