খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ই জুলাই ২০২৬, ৩:৪ পিএম

বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম তিন্দু বড় পাথর এলাকায় সাঙ্গু নদীতে পর্যটকবাহী একটি নৌকা ডুবে জাওয়াদ উল ইসলাম মাহিয়ান নামে এক পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে এলাকাটি ‘রাজাপাথর’ নামে পরিচিত। শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেল ৫টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। শনিবার (২৫ জুলাই) দুপুর পর্যন্ত নিখোঁজ পর্যটকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। তাকে উদ্ধারে স্থানীয় বাসিন্দা, নৌকার মাঝি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা নদীর বিভিন্ন অংশে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন।
নিখোঁজ জাওয়াদ উল ইসলাম মাহিয়ান ময়মনসিংহ জেলার মাসকান্দা গ্রামের বাসিন্দা বলে জানা গেছে। দুর্ঘটনার পর তার পরিবারের সদস্য ও সহযাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। তবে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় তাকে জীবিত উদ্ধারের আশায় অপেক্ষা করছেন স্বজনরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দুপুরে ১৩ জনের একটি পর্যটক দল আলীকদম-থানচি সড়কের ২৩ কিলোমিটার এলাকা দিয়ে নেমে থানচির তিন্দু বাজারে পৌঁছায়। সেখানে তাদের সঙ্গে স্থানীয় গাইড গর্জেন ত্রিপুরা যোগ দেন। পরে বিকেলে দলটি তিন্দু ঘাট থেকে দুটি নৌকায় করে রেমাক্রির উদ্দেশে রওনা হয়। একটি নৌকায় ছিলেন ছয়জন এবং অন্য নৌকায় ছিলেন সাতজন পর্যটক।
রেমাক্রির পথে দলটি তিন্দু বড় পাথর এলাকায় পৌঁছালে সাঙ্গু নদীর প্রবল স্রোতের মধ্যে ছয়জন আরোহী থাকা নৌকাটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডুবে যায়। আকস্মিক দুর্ঘটনায় নৌকায় থাকা পাঁচ পর্যটক সাঁতরে নদীর তীরে উঠতে সক্ষম হন। কিন্তু জাওয়াদ উল ইসলাম মাহিয়ান স্রোতের টানে নদীতে ভেসে গিয়ে নিখোঁজ হন।
দুর্ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং নিখোঁজ পর্যটকের সন্ধানে তল্লাশি শুরু করেন। পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত হন। নদীর বিভিন্ন অংশে খোঁজ চালানো হলেও শনিবার দুপুর পর্যন্ত তার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
উদ্ধারকাজে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সাঙ্গু নদীর তীব্র স্রোত ও দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশ। বর্ষাকালে পাহাড়ি নদীগুলোতে পানির প্রবাহ ও স্রোতের গতি বেড়ে যাওয়ায় নৌযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। তিন্দু থেকে রেমাক্রির পথে সাঙ্গু নদীর কিছু অংশে পাথুরে চর, প্রবল স্রোত ও দুর্গম নদীতীর থাকায় দুর্ঘটনার পর দ্রুত তল্লাশি চালানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
থানচি পর্যটক গাইড সমিতির সভাপতি জ ওয়াই প্রু মারমা জানান, পর্যটক দলটি আলীকদম-থানচি সড়ক হয়ে তিন্দু এলাকায় পৌঁছানোর পর স্থানীয় গাইডের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তবে থানচি উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না করেই তারা রেমাক্রির উদ্দেশে যাত্রা করেন। ফলে পর্যটকদের বিষয়ে প্রশাসনের কাছে আগে থেকে কোনো তথ্য ছিল না। দুর্ঘটনার পর নিখোঁজ ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতেও এ কারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়।
থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ-আল-ফয়সাল জানান, শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে তিন্দু বড় পাথর এলাকায় প্রবল স্রোতের মধ্যে পর্যটকবাহী একটি নৌকা ডুবে যায়। এতে একজন পর্যটক নিখোঁজ হয়েছেন। তাকে উদ্ধারে অভিযান চালানো হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, পর্যটকরা থানচিতে এসে উপজেলা প্রশাসনের নির্ধারিত নিবন্ধন ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন না করায় দুর্ঘটনার পরপরই নিখোঁজ পর্যটকের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরে বিভিন্ন সূত্রে তার নাম ও পরিচয় জানা যায়।
ঘটনাটি বান্দরবানের দুর্গম পর্যটন এলাকাগুলোতে বর্ষাকালে ভ্রমণ নিরাপত্তার বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। বর্ষা মৌসুমে সাঙ্গু নদীসহ পাহাড়ি নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়ে এবং অনেক স্থানে স্রোত তীব্র হয়ে ওঠে। ফলে পর্যটকদের নৌযাত্রার আগে স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, অভিজ্ঞ গাইডের পরামর্শ অনুসরণ করা এবং প্রশাসনের নির্ধারিত নিবন্ধন ও নিরাপত্তাবিধি মেনে চলা জরুরি।
বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় কোনো পর্যটক দলের গতিবিধি সম্পর্কে প্রশাসনের কাছে আগাম তথ্য থাকলে জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা সহজ হয়। স্থানীয় গাইডদেরও আবহাওয়া ও নদীর স্রোতের অবস্থা বিবেচনা করে নৌযাত্রার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, নিখোঁজ জাওয়াদ উল ইসলাম মাহিয়ানের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট উদ্ধারকারীরা সাঙ্গু নদীর বিভিন্ন অংশে তার সন্ধান করছেন। তবে দুর্গম এলাকা ও প্রবল স্রোতের কারণে অভিযান পরিচালনায় প্রতিকূলতা রয়েছে। শনিবার দুপুর পর্যন্ত তার সন্ধান না মেলায় স্বজন ও সহযাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাকে উদ্ধারে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
মন্তব্য