
বাংলাদেশের বিপক্ষে আসন্ন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজকে অস্ট্রেলিয়া যে মোটেও হালকাভাবে নিচ্ছে না, দল ঘোষণার পর সেটি আরও স্পষ্ট হয়েছে। দীর্ঘ চোটের পর নিয়মিত অধিনায়ক প্যাট কামিন্সের প্রত্যাবর্তন, অভিজ্ঞ পেসার জশ হ্যাজলউডের অন্তর্ভুক্তি এবং বিশ্বমানের অফ-স্পিনার নাথান লায়নের উপস্থিতি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে কঠিন এক ক্রিকেটীয় পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে বাংলাদেশ টেস্ট দলের অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এই শক্তিশালী স্কোয়াডকে শুধু চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন না; বরং এর মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সম্মান এবং নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণের বড় সুযোগও দেখছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ডারউইন ও ম্যাকেতে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলবে বাংলাদেশ। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে অস্ট্রেলিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম শক্তিশালী দল। সেই দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে খেলতে নামা বাংলাদেশের জন্য বরাবরই কঠিন কাজ। এবার সেই চ্যালেঞ্জ আরও বড় হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী দল নির্বাচনের কারণে।
শুক্রবার মিরপুরে নতুন কুঁড়ি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের ফাইনাল শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অস্ট্রেলিয়ার দল নির্বাচন নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানান নাজমুল। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা নিয়ে তিনি যেমন সচেতন, তেমনি এই সিরিজকে নিজেদের উন্নতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবেও দেখছেন।
নাজমুলের মতে, বড় দলগুলো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ সিরিজে প্রায়ই নিয়মিত খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দিয়ে নতুন ক্রিকেটারদের সুযোগ দেয়। কখনো কখনো দলেও ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। কিন্তু বাংলাদেশের বিপক্ষে এবার অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াডে সেই ধরনের বড় কোনো ছাড় দেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে না। বরং অভিজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারদের নিয়ে দল সাজিয়ে তারা সিরিজটিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে বলেই মনে করছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
তিনি বলেন, এমন দল নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে আসতে আগে খুব একটা দেখা যায়নি। বড় দলগুলোর ক্ষেত্রে সাধারণত বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রবণতা থাকে। কিন্তু এবার অস্ট্রেলিয়ার স্কোয়াড দেখে তাঁর মনে হয়েছে, সিরিজটি তারা গুরুত্বের সঙ্গেই নিচ্ছে। নাজমুলের চোখে, এটিকে বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য এক ধরনের অর্জনও বলা যায়।
বাংলাদেশ অধিনায়কের এই মূল্যায়নের পেছনে সাম্প্রতিক দ্বিপক্ষীয় সিরিজের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। গত জুনে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে অস্ট্রেলিয়া পূর্ণশক্তির দল নিয়ে মাঠে নামেনি। সেই সফরের ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের কাছে হারও দেখেছিল তারা। এবার অবশ্য টেস্ট ক্রিকেটে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে নিজেদের সেরা দলগুলোর অন্যতম অংশকে নিয়ে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে অস্ট্রেলিয়া।
এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সিরিজটি আত্মবিশ্বাস যাচাইয়েরও বড় মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ান বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে বাংলাদেশের ব্যাটাররা কতটা সময় উইকেটে টিকে থাকতে পারেন, নতুন বলের চাপ কীভাবে সামলানো যায় এবং প্রতিপক্ষের অভিজ্ঞ ব্যাটিং লাইনআপের বিপক্ষে বাংলাদেশের বোলাররা কতটা ধারাবাহিক থাকতে পারেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে মাঠেই।
নাজমুলের দৃষ্টিতে, বিশ্বের অন্যতম সেরা দলের বিপক্ষে খেলার সুযোগকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, প্রতিপক্ষের শক্তিশালী স্কোয়াড দেখে ভয় পাওয়ার চেয়ে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মনোযোগী হওয়া জরুরি। অস্ট্রেলিয়া যদি সিরিজকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে, তবে বাংলাদেশেরও নিজেদের সেরা ক্রিকেট খেলার দায়িত্ব রয়েছে।
এই সিরিজে বাংলাদেশের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের চোট। লিটন দাস ও নাহিদ রানার শারীরিক অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। তাদের খেলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ফিজিও ও মেডিকেল দলের মূল্যায়ন গুরুত্বপূর্ণ হবে বলে জানিয়েছেন নাজমুল। ফলে সিরিজ শুরুর আগে দলের ভারসাম্য নিয়েও কিছুটা অপেক্ষা করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
লিটন দাস বাংলাদেশের ব্যাটিং ইউনিটের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। অন্যদিকে নাহিদ রানা দলের পেস আক্রমণে গতি ও আগ্রাসন যোগ করতে পারেন। তাই দুজনেরই ফিটনেস পরিস্থিতি বাংলাদেশের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে অধিনায়ক স্পষ্ট করেছেন, চোটের বিষয়ে মেডিকেল দলের পরামর্শের বাইরে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে টেস্টে সফল হতে হলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হবে ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা। টেস্ট ক্রিকেটে একটি ভালো সেশন যেমন ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারে, তেমনি কয়েকটি ভুলও পুরো ম্যাচে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যাটিংয়ে দীর্ঘ সময় উইকেটে থাকা, বোলিংয়ে সঠিক জায়গায় বল করা এবং ফিল্ডিংয়ে সুযোগ হাতছাড়া না করা—তিন বিভাগেই উন্নত মানের পারফরম্যান্স প্রয়োজন হবে।
বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ব্যাটারদের সামনে নতুন বল সামলানো বড় পরীক্ষা হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় কন্ডিশন বুঝে স্পিনারদের কার্যকর ব্যবহার এবং পেসারদের সঠিক সময়ে আক্রমণে আনা দলের কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ম্যাচ পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই সিরিজের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ভবিষ্যতের দিক থেকেও। ভালো ফল শুধু র্যাঙ্কিং বা পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এমন সিরিজ তরুণ ক্রিকেটারদের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ দেয়। অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে প্রতিটি সেশন, প্রতিটি স্পেল এবং প্রতিটি ইনিংস থেকে শেখার সুযোগ থাকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের সিরিজগুলোতে কাজে লাগাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারে দল।
জাতীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশাবাদী নাজমুল। নতুন কুঁড়ি ক্রিকেট টুর্নামেন্টের মতো আয়োজন থেকে ভবিষ্যতে জাতীয় দলের ক্রিকেটার উঠে আসতে পারেন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু রাজধানী বা প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেট কেন্দ্র নয়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেই প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে আসা সম্ভব। এ জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা ও উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
রাজশাহীর ক্রিকেট অবকাঠামোর প্রশংসা করে নাজমুল বলেন, সেখানে ক্রিকেট নিয়ে নিয়মিত কাজ হচ্ছে এবং বিভিন্ন একাডেমিতে তরুণ ক্রিকেটারদের জন্য ভালো সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এই সুবিধা আরও বাড়ানো গেলে সেখান থেকে ভবিষ্যতে আরও প্রতিভাবান ক্রিকেটার উঠে আসতে পারেন বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে শক্তিশালী পাইপলাইন গড়ে তুলতে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট, স্থানীয় প্রতিযোগিতা, প্রশিক্ষণ সুবিধা এবং দক্ষ কোচিং ব্যবস্থার গুরুত্ব অনেক। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি দল যতই সফল হোক, নতুন ক্রিকেটার তৈরির ধারাবাহিক প্রক্রিয়া না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সেই সাফল্য ধরে রাখা কঠিন। নাজমুলের বক্তব্যে তাই শুধু অস্ট্রেলিয়া সিরিজের প্রস্তুতি নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়েও একটি বৃহত্তর ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
মিরপুরের অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানার উপস্থিতিও ছিল। পুরুষ ও নারী ক্রিকেটের প্রতিনিধিদের এমন আয়োজনে একসঙ্গে উপস্থিতি দেশের ক্রিকেটে নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড় তৈরির প্রয়োজনীয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে।
সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী স্কোয়াড বাংলাদেশের সামনে কঠিন এক পরীক্ষার মঞ্চ তৈরি করেছে। কামিন্স, হ্যাজলউড ও লায়নের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের উপস্থিতি প্রতিপক্ষের সামর্থ্য সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দেয়। তবে নাজমুল হোসেন শান্তর দৃষ্টিতে, এই কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। অস্ট্রেলিয়া সিরিজকে গুরুত্ব দিয়ে মাঠে নামলে বাংলাদেশের জন্যও নিজেদের টেস্ট সামর্থ্য প্রমাণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যায়, সেটিই হবে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
> অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে পেস আক্রমণ নিয়ে বড় দুশ্চিন্তায় বাংলাদেশ
> অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী দল বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ
> সাঙ্গু নদীতে নৌকাডুবি, থানচিতে পর্যটক নিখোঁজ
> সিলেট বিভাগে হাম-নিউমোনিয়ায় সাত মাসে ১০৮ শিশুর মৃত্যু
> রাজশাহীতে গ্রাম পুলিশের স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, বাড়িতে আগুন
> ধামরাইয়ে মহাসড়কে বাসের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত
> জামায়াত থেকে বহিষ্কার গাজী নজরুল, ইসিতে চিঠি
> জিজানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি হুথিদের
> ইনু মামলার রায় ঘিরে বিচারব্যবস্থার পরীক্ষা
> প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর দেশের ভাবমুর্তি ক্ষতিগ্রস্থ করেছে
> সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস শাখা, ঠিকানা ও ফোন নম্বর
> করিয়ারদিয়ায় মাছের ঘের দখলচেষ্টা, অস্ত্রসহ দুইজন জনতার হাতে আটক
> চাটখিলে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় যুবকের মৃত্যুদণ্ড
> আওয়ামী লীগের ৭৭ বছরের রাজনৈতিক গৌরবগাথা ও সংগ্রাম
> বানরের আতঙ্কে ভীত লালবাজারবাসী ডিসি বরাবর আবেদন
> ডিএনডি লেকে দুই কিশোরের মৃত্যু
> ফুলগাজীতে টিন কেটে ঘরে ঢুকে প্রবাসীর স্ত্রীকে হাত-পা বেঁধে হত্যা
© কপিরাইট ২০২৬ খবরওয়ালা। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
মন্তব্য