খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ১০:৫৩ পিএম

বাংলা সাহিত্যের বিস্তীর্ণ আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র রয়েছেন, যাঁদের আলো সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে যুগ যুগ ধরে আমাদের পথ দেখায়। আশাপূর্ণা দেবী ঠিক তেমনই এক উজ্জ্বল নাম। তিনি নিছক একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ছিলেন না; ছিলেন তীক্ষ্ণ সমাজ-পর্যবেক্ষক, মানবিক চেতনার বাতিঘর এবং বাঙালি নারীর আত্মমর্যাদা আদায়ের সংগ্রামের এক অকৃত্রিম ভাষ্যকার। সমাজের চারদেয়ালে বন্দি নারীদের না-বলা কথাগুলো তাঁর কলমেই পেয়েছিল প্রতিবাদের ভাষা।
১৯০৯ সালের ৮ জানুয়ারি কলকাতার এক রক্ষণশীল পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ছিলেন পেশায় চিত্রশিল্পী আর মা সরলাসুন্দরী দেবী ছিলেন পুরোদস্তুর সাহিত্যপ্রেমী। তখনকার সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের ঘরের বাইরে গিয়ে প্রথাগত স্কুলে পড়ার কোনো রেওয়াজ ছিল না। তাই স্কুলের চৌকাঠ পেরোনোর সুযোগ তাঁর কখনো হয়নি। তবে বইয়ের প্রতি তীব্র টান আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি নিজেই নিজের চিন্তার জগৎকে শানিত করেছিলেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও কেবল স্বশিক্ষার জোরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক বিস্ময়কর সাহিত্যিক।
মাত্র তেরো বছর বয়সে ছোটদের একটি পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর লেখালেখির হাতেখড়ি। এরপর আর কখনো পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টানা সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিরলসভাবে সাহিত্য সাধনা করে গেছেন। শিশুতোষ রচনা থেকে শুরু করে প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা—সব শাখাতেই তাঁর ছিল সাবলীল বিচরণ।
তাঁর সাহিত্যের মূল উপজীব্য ছিল চারপাশের সাধারণ মানুষের জীবন। মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের অন্দরমহলের হাসি-কান্না, পারিবারিক জটিলতা আর নারীদের নীরব বঞ্চনার গল্প তিনি নিপুণ হাতে তুলে এনেছেন। তাঁর লেখায় কোনো উগ্র স্লোগান ছিল না; বরং জীবনের খুব চেনা ছকের ভেতর দিয়েই তিনি এমন এক চরম সত্যকে সামনে এনেছেন, যা পাঠকের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, কেবল শাসনব্যবস্থা বা আইন দিয়ে নয়, মানুষের মন ও মূল্যবোধের পরিবর্তন হলেই সমাজের প্রকৃত মুক্তি আসবে।
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর রচিত ‘প্রথম প্রতিশ্রুতি’, ‘সুবর্ণলতা’ ও ‘বকুলকথা’ এক অনন্য মাইলফলক। তিন প্রজন্মের তিন নারীর জীবনসংগ্রাম, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আর মুক্তির যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা এই ত্রয়ী উপন্যাসে ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই বিরল। এটি শুধু নিছক গল্প নয়, বরং বাঙালি সমাজের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের এক জীবন্ত ইতিহাস। এছাড়া তাঁর বহু উপন্যাস পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ধারাবাহিকে রূপায়িত হয়ে বাংলার সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
একনজরে আশাপূর্ণা দেবী ও তাঁর সাহিত্যকর্ম
| বিবরণ | তথ্য |
| জন্ম | ৮ জানুয়ারি ১৯০৯ (কলকাতা) |
| পিতা ও মাতা | হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত এবং সরলাসুন্দরী দেবী |
| লেখার হাতেখড়ি | মাত্র তেরো বছর বয়সে পত্রিকায় কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে |
| সর্বমোট রচিত উপন্যাস | দেড় শতাধিক |
| ছোটগল্পের সংখ্যা | আড়াই হাজারেরও বেশি |
| মহাকাব্যিক ত্রয়ী | প্রথম প্রতিশ্রুতি, সুবর্ণলতা ও বকুলকথা |
| অন্যান্য কালজয়ী উপন্যাস | অগ্নিপরীক্ষা, যোগবিয়োগ, বলয়গ্রাস, ছায়াসূর্য, নবজন্ম |
| সর্বোচ্চ সম্মাননা | জ্ঞানপীঠ পুরস্কার (১৯৭৬) |
| অন্যান্য স্বীকৃতি | সাহিত্য অকাদেমি, রবীন্দ্র পুরস্কার, পদ্মশ্রী, দেশিকোত্তম |
| প্রয়াণ | ১৩ জুলাই ১৯৯৫ |
সাহিত্যের এই অসামান্য অবদানের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান থেকে শুরু করে অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পাওয়া কোটি কোটি পাঠকের অকৃত্রিম ভালোবাসা।
১৯৯৫ সালের ১৩ জুলাই এই মহীয়সী নারী পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন। মৃত্যু হয়তো তাঁর কলম থামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি আজও অমলিন। তিনি তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন—নীরব প্রতিবাদ আর আত্মমর্যাদাবোধ দিয়ে কীভাবে ইতিহাস রচনা করা যায়। প্রয়াণ দিবসে এই কালজয়ী কথাশিল্পীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। যতদিন বাংলা ভাষা ও সাহিত্য থাকবে, আশাপূর্ণা দেবী এক অবিনাশী দীপশিখার মতো আমাদের মনন, বিবেক ও আগামী দিনের পথকে আলোকিত করে যাবেন।
মন্তব্য