জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

সাইবার স্পেসে মাদক কারবার: সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড রেখে সংসদে বিল পাস

অনলাইন ও ভার্চুয়াল দুনিয়াকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা মাদকের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সিন্ডিকেটগুলোর শিকড় উপড়ে ফেলতে যুগান্তকারী এবং কঠোরতম পদক্ষেপ নিলো সরকার। ডার্ক ওয়েব, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ বা যেকোনো ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মাদকদ্রব্য কেনাবেচা, বিজ্ঞাপন, সরবরাহ এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ‘মৃত্যুদণ্ড’-এর বিধান রেখে জাতীয় সংসদে একটি সংশোধনী বিল পাস হয়েছে।

সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল’ পাসের জন্য সংসদের অধিবেশনে উত্থাপন করলে তা উপস্থিত সংসদ সদস্যদের কণ্ঠভোটে পাস হয়। নতুন এই সংশোধনীতে ভার্চুয়াল অপরাধ দমনের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের সুরক্ষায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি এবং দ্রুততম সময়ে মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।

যুগের প্রয়োজনে আইনের আধুনিকায়ন

দেশের প্রচলিত মাদক আইনে সশরীরে মাদক উৎপাদন, চোরাচালান, পরিবহন বা সরাসরি বিক্রির ক্ষেত্রে আগে থেকেই সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু ছিল। তবে বর্তমান সময়ে অপরাধীরা সনাতনী পদ্ধতি ছেড়ে আধুনিক প্রযুক্তির আড়ালে তাদের নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছে। এই ডিজিটাল রূপান্তরের কারণে অপরাধীদের চিহ্নিত করা ও শাস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই শূন্যতা দূর করতেই এবার আইনে কঠোর এই নতুন ধারা যুক্ত করা হলো।

এখন থেকে যেকোনো ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন বা সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপে যদি মাদক সংক্রান্ত প্রচার বা মধ্যস্থতাও করা হয়, তবে তা সমপরিমাণ গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

নতুন আইনের কঠোর ধারা ও শাস্তির পরিধি

পাস হওয়া সংশোধনী বিলের পরিধি সাধারণ আইনের চেয়ে অনেক বেশি আধুনিক ও বিস্তৃত। এর প্রধান প্রধান দিকগুলো হলো:

  • ডিজিটাল লেনদেনও অপরাধের আওতায়: সাইবার মাধ্যমে মাদক কেনাবেচার পর মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ, রকেট, নগদ), ই-ওয়ালেট কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সি (যেমন: বিটকয়েন বা যেকোনো ভার্চুয়াল মুদ্রা) ব্যবহার করে অর্থ আদান-প্রদান করলে তা কঠোর শাস্তির আওতায় আসবে।

  • সরাসরি মাদক উদ্ধার বাধ্যতামূলক নয়: সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো, সাইবার অপরাধের ক্ষেত্রে আসামির কাছে সশরীরে মাদক পাওয়া না গেলেও কেবল ডিজিটাল প্রমাণ, চ্যাটিং হিস্ট্রি বা ফরেনসিক ডেটার ভিত্তিতেই অপরাধ প্রমাণ করা যাবে।

  • সাধারণ ও আন্তর্জাতিক চক্রের সাজা: অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তিকে যেকোনো মেয়াদের কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে, সাথে অনূর্ধ্ব ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। তবে এই চক্রটি যদি কোনো আন্তর্জাতিক চোরাচালান বা সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের অংশ হয়, তবে সাজা বেড়ে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

ডিএনসি-র সক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল

ডিজিটাল অপরাধের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অভিযানের পরিধি বাড়াতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন থেকে ডিএনসি নিজস্ব ‘ডগ স্কোয়াড’ গঠন করতে পারবে। মাদক চোরাকারবারিদের প্রাণঘাতী অস্ত্রের আক্রমণ ঠেকাতে সংস্থার কর্মকর্তাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বহনের প্রাধিকার (অনুমতি) মঞ্জুর করা হয়েছে। এর বাইরে, দেশের মাদকপ্রবণ এলাকাগুলোতে ঝুলে থাকা মামলার জট দ্রুত কমিয়ে অপরাধীদের দ্রুত সাজার আওতায় আনতে আলাদা ‘মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে।

‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সোমবার বিলটি পাসের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ার আগে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এটি জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর জন্য কিছু প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তবে তা কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। বিলের ওপর সাধারণ আলোচনাকালে কয়েকজন সংসদ সদস্য উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন বা অপরাধীদের সুবিধা দেন।

এই বিষয়ের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদকে আশ্বস্ত করে কড়া ভাষায় বলেন:

“মাদক কেনাবেচা কিংবা চোরাচালানের সাথে যদি আমাদের বাহিনীর কোনো সদস্যের সামান্যতম সম্পৃক্ততাও পাওয়া যায়, তবে তাকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হচ্ছে না এবং হবেও না। সাধারণ অপরাধীদের মতোই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”

নতুন এই কঠোর বিল পাসের মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজকে মাদকের এই অদৃশ্য ডিজিটাল থাবা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকেরা।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর