খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ১১:৪৫ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের স্পর্শকাতর জলসীমায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা এবার এক বিস্ফোরক ও নজিরবিহীন মোড় নিয়েছে। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান লাইফলাইন বা ধমনি হিসেবে পরিচিত ‘হরমুজ প্রণালি’ মার্কিন সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন প্রশাসনের এই রণকৌশল কেবল প্রণালি দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এই আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়ে যাতায়াতকারী বিশ্বের সমস্ত বাণিজ্যিক ও কার্গো জাহাজের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ হারে শুল্ক বা ট্রানজিট ফি ধার্য করার একটি বিতর্কিত পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছেন তিনি। ট্রাম্পের যুক্তি, এই চরম ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ওয়াশিংটনকে যে বিপুল অর্থ ও জনবল বিনিয়োগ করতে হচ্ছে, তার ব্যয়ভার এখন থেকে ব্যবহারকারী দেশগুলোকেই বহন করতে হবে।
সোমবার সকালে মার্কিন প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন অবস্থানের কথা জানান। তিনি সাফ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র এবার থেকে হরমুজ প্রণালির মূল অভিভাবক বা রক্ষকের ভূমিকা পালন করতে যাচ্ছে।” তেহরানের যেকোনো ধরনের উসকানি বা হামলা মোকাবিলায় ওয়াশিংটন যে পুরোপুরি প্রস্তুত, তা উল্লেখ করে তিনি জানান, খুব শিগগিরই মার্কিন সামরিক বাহিনী এই জলসীমার কৌশলগত পয়েন্টগুলো নিজেদের দখলে নেবে এবং এর সামগ্রিক পরিচালনা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে। মধ্যপ্রাচ্যের এই জলসীমায় গত সপ্তাহান্তেই ইরান ও মার্কিন নৌবাহিনীর মধ্যে তীব্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির রেশ কাটতে না কাটতেই ট্রাম্পের কাছ থেকে এমন সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের ঘোষণা এলো।
ফক্স নিউজের ওই সাক্ষাৎকারের পরপরই নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ট্রাম্প এই পরিকল্পনার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দিকগুলো আরও স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, হোয়াইট হাউস ইরানের ওপর আবারও সর্বোচ্চ স্তরের অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ আরোপের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি করছে। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বার্থে অন্যান্য দেশগুলো যাতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সেই সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হবে। তবে এই সুরক্ষার বিনিময়ে, এক ধরনের ‘ন্যায্যতার’ খাতিরে, সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজের মালামালের ওপর ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। ট্রাম্পের মতে, মার্কিন নৌসেনারা জীবন বাজি রেখে যে নিরাপত্তা দেবে, তার খরচ অন্য দেশগুলো বিনামূল্যে ভোগ করতে পারে না।
ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত এই হরমুজ প্রণালিকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে সংবেদনশীল রুট বিবেচনা করা হয়। তথ্যমতে, বিশ্ব বাজারে সমুদ্রে পরিবাহিত মোট খনিজ তেলের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি কেবল এই সংকীর্ণ জলপথটি দিয়েই পার হয়। ফলে এই প্রণালির সামান্যতম অচলাবস্থাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়িয়ে দেয়, যা পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের মন্দা ডেকে আনতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন ও ইরানি সামরিক বাহিনীর পাল্টাপাল্টি মহড়া ও সংঘাতের জেরে এই অঞ্চলটি কার্যত একটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের এই প্রণালি দখল এবং ট্রানজিট ফি আদায়ের একতরফা ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি ও মুক্ত বিশ্ব বাণিজ্যের সমীকরণকে এক মহাক্রান্তিকালের দিকে ঠেলে দেবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কৌশলগত বিশ্লেষকরা।
মন্তব্য