খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ৭:৬ পিএম

টানা অতিবর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক পাহাড় ধসে দেশের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। বিভিন্ন জেলায় বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে এখন ৫৪ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশের সাতটি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় এখনও পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন ১ লাখ ৫০ হাজারেরও বেশি পরিবার। দুর্গত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও জরুরি বাসস্থানের সংকট তীব্র হয়ে উঠছে।
সোমবার বিকেলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যা পরিস্থিতি সংক্রান্ত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত এই জেলাগুলোতে বর্তমানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯ হাজার ৪১১ জনে। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—এই সাতটি জেলা এখন বন্যাকবলিত। এসব জেলার মোট ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন এবং ১২টি পৌরসভা পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।
এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। জেলাটিতে পাহাড় ধস ও আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন পর্যন্ত শুধু কক্সবাজারেই ৩১ জনের মৃত্যু খবর পাওয়া গেছে, যার মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করার কারণে ভূমিধসে এই বিপুল প্রাণহানি ঘটে। এছাড়া জেলাটিতে আহত হয়েছেন অন্তত ২৪ জন এবং এখনও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যান্য জেলার মধ্যে চট্টগ্রামে ১৩ জন, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৬ জন, রাঙামাটিতে ৩ জন এবং মৌলভীবাজারে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বাস্তুচ্যুত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জরুরি আশ্রয়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় উপদ্রুত এলাকাগুলোতে মোট ১ হাজার ৪৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে এ পর্যন্ত আশ্রয় নিয়েছেন ৩৮ হাজার ৪২২ জন মানুষ। সবচেয়ে বেশি ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে চট্টগ্রামে, যেখানে ১৬ হাজার ৮২১ জন মানুষ অবস্থান করছেন। এছাড়া বান্দরবানের ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রে ৫ হাজার ১৩৪ জন, রাঙামাটির ৪৭টি কেন্দ্রে ৩ হাজার ৪৮৭ জন, কক্সবাজারের ৭টি কেন্দ্রে ৪ হাজার ১৩১ জন এবং মৌলভীবাজারের ১৪টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ২৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। খাগড়াছড়িতে ১৫০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত থাকলেও সেখানে মাত্র ৭৪ জন মানুষ উঠেছেন এবং হবিগঞ্জের দুটি আশ্রয়কেন্দ্রে এখনও কোনো দুর্গত মানুষ আশ্রয় নেননি।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, উপদ্রুত জেলাগুলোতে সরকারিভাবে ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। দুর্গতদের সহায়তায় এ পর্যন্ত মোট ৮ হাজার ৯৫০ টন চাল এবং ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। জেলাভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে ১ হাজার ২০০ টন চাল ও ৬৫ লাখ টাকা, কক্সবাজারে ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রাঙামাটিতে ৫০০ টন চাল ও ২৫ লাখ টাকা, বান্দরবানে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা, খাগড়াছড়িতে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা, মৌলভীবাজারে ২০০ টন চাল ও ১০ লাখ টাকা এবং হবিগঞ্জে ১০০ টন চাল ও ৫ লাখ টাকা নগদ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকেও রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা হিসেবে ২০ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত উদ্ধারকাজ ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া জোরদার করার চেষ্টা চলছে।
মন্তব্য