দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে স্মরণকালের ভয়াবহ মন্দা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬.২০ শতাংশে। এটি কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার (৭.২%) চেয়ে কম নয়, বরং গত দেড় দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন হার। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ এবং বিরাজমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় এই স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে।
Table of Contents
ঋণপ্রবাহের তুলনামূলক চিত্র ও নিম্নমুখী ধারা
২০২৪ সালের জুলাই মাসে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি সর্বশেষ দুই অঙ্কের ঘরে (১০.১৩%) ছিল। এরপর থেকেই প্রবৃদ্ধির গ্রাফ ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নামছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে যা ৭.২৮ শতাংশ ছিল, এক বছরের ব্যবধানে তা ১ শতাংশের বেশি কমেছে। গত টানা সাত মাস ধরে এই সূচকটি ৭ শতাংশের নিচেই অবস্থান করছে, যা বিনিয়োগ পরিস্থিতির নাজুক অবস্থাকেই ফুটিয়ে তোলে।
বেসরকারি খাতের ঋণ পরিস্থিতির মূল পরিসংখ্যান:
| সূচকের বিবরণ | তথ্য ও পরিসংখ্যান (২০২৫) | অর্থনৈতিক প্রভাব |
| ডিসেম্বর শেষে ঋণ প্রবৃদ্ধি | ৬.২০% | লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১% কম। |
| নভেম্বর মাসের প্রবৃদ্ধি | ৬.৫৮% | ধারাবাহিক পতনের চিত্র। |
| মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি | ১৬% হ্রাস (জুলাই-নভেম্বর) | নতুন কলকারখানা স্থাপনে স্থবিরতা। |
| নীতি সুদহার (Policy Rate) | ১০% | ঋণের খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। |
| সার্বিক মূল্যস্ফীতি (ডিসেম্বর) | ৮.৪৯% | বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সংশয়। |
বিনিয়োগে স্থবিরতা ও শিল্প খাতের সংকট
অর্থনীতিবিদদের মতে, বেসরকারি ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ হলো শিল্প খাতের প্রসারে স্থবিরতা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করে বলেন, “ব্যবসায়ীরা এখন নতুন বিনিয়োগে সাহসী হচ্ছেন না। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণের ঝুঁকি কেউ নিতে চাইছেন না।” তিনি মনে করেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির গতি ধীর হয়ে পড়বে।
শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কিছু বড় শিল্প গ্রুপ যেমন—বেক্সিমকো, নাসা এবং গাজী গ্রুপের উৎপাদন কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। সচল থাকা কারখানাগুলোও বর্তমানে তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন ৬০-৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে আসছে।
চড়া সুদহার ও ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। বর্তমানে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ হওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদহার ১১ থেকে ১২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিকেএমইএ-র সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, বর্তমানে কাজের আদেশ কম থাকায় এবং ঋণের সুদহার অত্যাধিক বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা সচল রাখা কিংবা সম্প্রসারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো এখন ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের নতুন কৌশলী অবস্থান
বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা না থাকায় ব্যাংকগুলো এখন তাদের আমানত সুরক্ষায় বিকল্প পথ খুঁজছে। ঝুঁকি এড়াতে অধিকাংশ ব্যাংক এখন সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে।
নিরাপদ আয়: সরকারি সিকিউরিটিজে প্রায় ১১ শতাংশ পর্যন্ত নিশ্চিত মুনাফা পাওয়া যাচ্ছে।
ব্যালেন্স শিট শক্তিশালীকরণ: ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি না থাকায় ব্যাংকগুলো ট্রেজারি বন্ডকেই আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছে।
সরকারি ঋণ গ্রহণ: বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিচ্ছে, যা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি সহজ আয়ের পথ তৈরি করেছে।
উপসংহার
বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের এই মন্থর গতি দেশের শিল্পায়নের জন্য একটি অশনি সংকেত। কলকারখানা ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়া মানেই হলো দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক মন্দার হাতছানি। এই স্থবিরতা কাটাতে হলে দ্রুত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এনে ঋণের সুদহার কমিয়ে আনা এবং বিনিয়োগবান্ধব রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নীতিনির্ধারকরা যদি এখনই বেসরকারি খাতের আস্থা ফেরাতে না পারেন, তবে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
