খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৩ই জুলাই ২০২৬, ২:৩৮ পিএম

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার পাহাড়পুর গ্রামে নিজ বাড়ি থেকে এক দম্পতির মরদেহ উদ্ধারকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার সকালে সফাপুর ইউনিয়নের ওই গ্রামে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা থাকলেও পুলিশ বলছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের অগ্রগতি ছাড়া এ ঘটনায় নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
নিহতরা হলেন পাহাড়পুর গ্রামের বাসিন্দা লোকমান মণ্ডল (৫৫) এবং তাঁর স্ত্রী দেলোয়ারা বেগম (৪৫)। পরিবার ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাতেও তাঁদের আচরণ ছিল স্বাভাবিক। রাতের খাবার খেয়ে প্রতিদিনের মতোই তাঁরা ঘুমাতে যান। সে সময় পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীদের কাছে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনার ইঙ্গিত মেলেনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার ভোর প্রায় ৪টার দিকে তাঁদের ছেলে মুক্তার হোসেন দেখতে পান, বাবা-মা কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। বিষয়টি বুঝতে না পেরে তিনি আশপাশের প্রতিবেশীদের ডাকেন। প্রতিবেশীরা দ্রুত বাড়িতে গিয়ে খাটের ওপর স্বামী-স্ত্রীর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। পরে সঙ্গে সঙ্গে মহাদেবপুর থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ দুটি উদ্ধার করে।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পাহাড়পুর গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় উদ্বেগ ও কৌতূহল তৈরি হয়। কীভাবে একই সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর মৃত্যু হলো, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, নিহত দম্পতির ছেলে মুক্তার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে নেশা ও মোবাইলে জুয়ায় আসক্ত ছিলেন বলে এলাকায় পরিচিত। তাঁদের অভিযোগ, নেশার জন্য তিনি প্রায়ই বাবা-মায়ের কাছে টাকা চাইতেন এবং সম্প্রতি এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধও তৈরি হয়েছিল।
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় পর্যায়ে কেউ কেউ ধারণা করছেন, বিষাক্ত কোনো পদার্থ সেবনের কারণে এই মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এসবই স্থানীয়দের ব্যক্তিগত বক্তব্য ও অনুমান। এখন পর্যন্ত তদন্তে এমন কোনো অভিযোগের সত্যতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়নি। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা ঘটনার সঙ্গে এ মৃত্যুর সম্পর্ক রয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
মহাদেবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক জানান, সংবাদ পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করেছে এবং মরদেহ দুটি উদ্ধার করে নওগাঁ সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রাথমিকভাবে বিষক্রিয়াজনিত মৃত্যুর সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে এটি কেবল প্রাথমিক পর্যায়ের একটি সম্ভাবনা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ফরেনসিক পরীক্ষা এবং অন্যান্য তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে মৃত্যুর আগে দম্পতির চলাফেরা, তাঁদের পারিবারিক সম্পর্ক, সাম্প্রতিক কোনো বিরোধ, আর্থিক বা সামাজিক কোনো চাপ ছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে প্রযুক্তিগত তথ্য ও অন্যান্য আলামতও বিশ্লেষণ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
একই পরিবারের দুই সদস্যের একসঙ্গে রহস্যজনক মৃত্যু যে কোনো ক্ষেত্রেই সংবেদনশীল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এ ধরনের ঘটনায় মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক পরীক্ষার ফল, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো গুজব বা অসমর্থিত তথ্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এদিকে এই ঘটনায় পাহাড়পুর গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি, যদি কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে, তবে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। পুলিশও জানিয়েছে, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণ এবং ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
মন্তব্য