খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ই জুলাই ২০২৬, ১০:০ পিএম

দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা সভা করেছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি। বৈঠকে দলের নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবায়ন অগ্রগতি, তৃণমূল পুনর্গঠন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশ সফর এবং বৈশ্বিক নানা সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সভার এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। এর আগে, শনিবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এই নীতিনির্ধারণী বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যরা সশরীরে অংশ নেন এবং মালয়েশিয়া থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস।
সভায় বর্তমান সরকারের নেওয়া বিভিন্ন অগ্রাধিকারভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। বিশেষ করে প্রান্তিক মানুষের জন্য চালু হওয়া ফ্যামিলি কার্ড, প্রান্তিক চাষিদের জন্য কৃষক কার্ড, দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সেবকদের জন্য বিশেষ ভাতা প্রদানের কার্যক্রমের অগ্রগতিতে গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে স্থায়ী কমিটি। সভায় আশা প্রকাশ করা হয়, জনকল্যাণমুখী এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে দলের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্যক্তিগত তদারকি ও দূরদর্শী উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন স্থায়ী কমিটির নেতারা।
তবে সরকারের এই উন্নয়নযাত্রার বিপরীতে বিরোধী দলগুলোর জোটের কর্মকাণ্ড নিয়ে সভায় সমালোচনা করা হয়। নেতৃবৃন্দ বলেন, বিরোধী দলগুলোর ‘জুলাই সনদ’ এবং গণভোটের দাবি আসলে জনগণকে মূল ধারা থেকে বিভ্রান্ত করার একটি অপচেষ্টা মাত্র। এই ধরনের রাজনৈতিক বিভ্রান্তি দূর করতে এবং দেশের মানুষের কাছে প্রকৃত উন্নয়ন এজেন্ডাগুলো আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য দলীয় প্রচার ও তৃণমূলের সাংগঠনিক তৎপরতা একযোগে জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সামনে আসতে যাওয়া স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তৃণমূল পর্যায়ে দলীয় ইউনিটগুলোকে পুরোদমে সক্রিয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সভা থেকে। পাশাপাশি চলমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রেক্ষাপটে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে বিএনপির জাতীয় কার্যকরী কমিটির সভা ডাকার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই বিশেষ সভা আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে।
বৈঠকে ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও ভোটের পরিসংখ্যান নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হয়। এই নির্বাচনের সার্বিক ভালো-মন্দ দিক এবং প্রাপ্ত ভোট ও আসনভিত্তিক হিসাব পর্যালোচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রস্তুত করার জন্য স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া ও চীন সফরের বিভিন্ন দিক ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়। স্থায়ী কমিটির সদস্যরা মনে করেন, বন্ধুপ্রতিম এই দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন অংশীদারত্ব আরও মজবুত করতে এই সফরগুলো অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখবে। একটি সফল ও দূরদর্শী কূটনীতির জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিনন্দন জানায় স্থায়ী কমিটি।
তবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সভায়। যুদ্ধ পরিহার করে আলোচনার টেবিলে বসে peaceful সমাধানের আহ্বান জানিয়ে সভার নেতৃবৃন্দ বলেন, এই অনাকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধের কারণে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্ব অর্থনীতি আজ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলবে।
একই সঙ্গে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়াকে দেশের জন্য এক ঐতিহাসিক ও গৌরবোজ্জ্বল অর্জন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। স্থায়ী কমিটির মতে, এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এর ফলে দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ আরও শক্তিশালী কূটনৈতিক ভূমিকা রাখতে পারবে। সবশেষে দেশের অভ্যন্তরে মাদক সমস্যার ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এটি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্ক্ষলা বাহিনীকে আরও কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দলীয় কার্যক্রমকে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আরও সক্রিয় করতে যুবদল, ছাত্রদলসহ বিএনপির সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য