খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জুলাই ২০২৬, ১২:৫ এএম

পারিবারিক কলহের জেরে শাশুড়ির গায়ে দাহ্য পদার্থ ঢেলে পুড়িয়ে মারার নৃশংস ঘটনায় মেহেরপুরে এক ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিকে অর্থদণ্ডও করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুরে মেহেরপুর জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক আলী মাসুদ শেখ জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। দীর্ঘ ১০ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও সওয়াল-জবাব শেষে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির নাম হাউস আলী (৫২)। তিনি মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার ষোলটাকা গ্রামের বাসিন্দা মহাম্মদ আলীর ছেলে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। পরে কড়া পাহারায় তাকে জেলা কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (পিপি) মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন রায়ের বিষয়টি সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করে আদালতের এই রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণী ও আদালত সূত্রে জানা যায়, এই পারিবারিক সহিংসতার সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় এক দশক আগে। ২০১৬ সালে হাউস আলীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর পারিবারিক নানা বিষয়ে চরম বিরোধ তৈরি হয়। বনিবনা না হওয়ায় একপর্যায়ে হাউস আলীকে আনুষ্ঠানিকভাবে তালাক দেন তাঁর স্ত্রী। এই বিবাহবিচ্ছেদকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি হাউস আলী। তাঁর মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল এবং এর জন্য তিনি তাঁর শাশুড়ি ফুলসুরাতনকে (৬৫) এককভাবে দায়ী করেন। তাঁর ধারণা ছিল, শাশুড়ির উসকানি ও হস্তক্ষপের কারণেই তাঁর সংসার ভেঙেছে।
এই প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে ২০১৬ সালের এক রাতে শাশুড়ি ফুলসুরাতনের ওপর চড়াও হন হাউস আলী। বৃদ্ধা ফুলসুরাতন যখন বাড়িতে একা ছিলেন, তখন হাউস আলী তাঁর শরীরে দাহ্য পদার্থ (সম্ভবত পেট্রোল বা কেরোসিন) ঢেলে দিয়ে আগুন লাগিয়ে দেন। আগুনে বৃদ্ধার শরীরের এক বিশাল অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। সেখানে বেশ কিছুদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৬৫ বছর বয়সী ফুলসুরাতন।
| বিবরণ | মামলার বিবরণ ও রায় |
| দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি | হাউস আলী (৫২) |
| পিতার নাম ও ঠিকানা | মহাম্মদ আলী, ষোলটাকা গ্রাম, গাংনী, মেহেরপুর |
| ভুক্তভোগী (নিহত) | ফুলসুরাতন (৬৫), আসামির শাশুড়ি |
| মামলার বাদী | আম্বিয়া খাতুন (নিহতের মেয়ে) |
| সংশ্লিষ্ট থানা | গাংনী থানা, মেহেরপুর |
| হত্যাকাণ্ডের সাল | ২০১৬ খ্রিস্টাব্দ |
| আদালতের নাম | জেলা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, মেহেরপুর |
| রায় প্রদানকারী বিচারক | আলী মাসুদ শেখ |
| প্রধান শাস্তি | যাবজ্জীবন কারাদণ্ড |
| অতিরিক্ত শাস্তি | অর্থদণ্ড |
| রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী | মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন (পিপি) |
এই মর্মান্তিক ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের পর নিহতের আরেক মেয়ে আম্বিয়া খাতুন বাদী হয়ে গাংনী থানায় হাউস আলীকে প্রধান আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ ঘটনার তদন্ত শেষে আসামির বিরুদ্ধে আদালতে সুনির্দিষ্ট চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করে।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: বিচারক তাঁর রায়ে উল্লেখ করেন, পারিবারিক আক্রোশের জেরে একজন বয়স্ক ও অসহায় নারীকে এভাবে পুড়িয়ে মারা জঘন্যতম অপরাধ। রাষ্ট্রপক্ষ আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় আদালত এই শাস্তি দিয়েছেন।
এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে অপরাধ প্রবণতা কমবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারটি ন্যায়বিচার পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। অন্যদিকে, নিহতের পরিবার আদালতের এই রায়ে স্বস্তি প্রকাশ করেছে।
মন্তব্য