খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৯ই জুলাই ২০২৬, ৫:৫৮ পিএম

আজ রাতেই লেখা হতে পারে বিশ্ব ফুটবলের নতুন এক অধ্যায়। একটি জয় বদলে দিতে পারে একটি দেশের ফুটবল ইতিহাস, বাড়িয়ে দিতে পারে কোটি মানুষের আত্মবিশ্বাস। বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় যুক্তরাষ্ট্রের মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হবে বর্তমান শক্তিধর ফ্রান্স ও ইতিহাস গড়ার স্বপ্নে বিভোর মরক্কো।
প্রায় ৭১ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার আধুনিক এই স্টেডিয়াম পরিণত হবে আবেগ, উত্তেজনা ও স্বপ্নের মিলনস্থলে। একদিকে থাকবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের সমর্থকদের নীল উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে মরক্কোর সমর্থকদের লাল-সবুজ পতাকার ঢেউ। ছাদ বন্ধ স্টেডিয়ামের ভেতরে প্রতিটি শট, প্রতিটি ট্যাকল এবং প্রতিটি গোলের সুযোগে তৈরি হবে তীব্র উত্তেজনা। এমন বড় মঞ্চে শুধু দক্ষতাই নয়, খেলোয়াড়দের মানসিক দৃঢ়তাও হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
ফ্রান্স মাঠে নামবে শিরোপা ধরে রাখার স্বপ্ন নিয়ে। অন্যদিকে মরক্কোর লক্ষ্য শুধু একটি ম্যাচ জয় নয়, বরং আফ্রিকার ফুটবল ইতিহাসে আরও বড় এক মাইলফলক তৈরি করা। বিশ্বকাপের মঞ্চে আফ্রিকার কোনো দল এখনো ফাইনালে উঠতে পারেনি। তাই মরক্কোর প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরো মহাদেশের প্রত্যাশা।
দুই দলের মুখোমুখি পরিসংখ্যানে এগিয়ে রয়েছে ফ্রান্স। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত ১৩ বার দেখা হয়েছে তাদের। এর মধ্যে ফ্রান্স জয় পেয়েছে সাতবার, মরক্কো জিতেছে দুটি ম্যাচে এবং চারটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। তবে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে অতীতের পরিসংখ্যান অনেক সময়ই গুরুত্ব হারায়। একটি ভুল, একটি অসাধারণ মুহূর্ত কিংবা একটি ব্যক্তিগত নৈপুণ্য পুরো ম্যাচের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে।
চলতি বিশ্বকাপে দুই দলের পারফরম্যান্সও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফ্রান্স গ্রুপ পর্বে দারুণ ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে। তারা জাপানকে ৩-০, প্যারাগুয়েকে ২-০ এবং কানাডাকে ২-১ গোলে হারিয়ে পূর্ণ পয়েন্ট নিয়ে নকআউট পর্বে ওঠে। এরপর শেষ ষোলোতে প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে। চার ম্যাচে ফ্রান্স করেছে আট গোল, বিপরীতে হজম করেছে মাত্র একটি।
মরক্কোর পথচলাও ছিল প্রশংসনীয়। গ্রুপ পর্বে তারা দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-০ ও পেরুকে ১-০ গোলে হারায়। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করে গ্রুপের শীর্ষ দল হিসেবে পরের রাউন্ডে যায় আফ্রিকার দলটি। শেষ ষোলোতে কানাডাকে ৩-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দেয় তারা। চার ম্যাচে মরক্কোর গোল সাতটি, আর গোল হজম করেছে মাত্র একটি। তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সংগঠিত রক্ষণ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ফুটবল এবং দ্রুত পাল্টা আক্রমণ।
ফ্রান্সের আক্রমণভাগের প্রধান অস্ত্র কিলিয়ান এমবাপ্পে। গতি, বল নিয়ন্ত্রণ এবং বড় ম্যাচে পারফর্ম করার ক্ষমতার কারণে তিনি প্রতিপক্ষের জন্য সবসময় বড় হুমকি। তার সঙ্গে আক্রমণে থাকবেন উসমান দেম্বেলে, যিনি ড্রিবলিং ও গতির মাধ্যমে রক্ষণভাগে চাপ তৈরি করতে পারেন। মাঝমাঠে অরেলিয়েন শুয়ামেনি দলের ভারসাম্য রক্ষা করবেন, আর রক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন উইলিয়াম সালিবা।
মরক্কোর শক্তি তার দলীয় সমন্বয়ে। ডান প্রান্তে আশরাফ হাকিমির গতি ও আক্রমণাত্মক ভূমিকা ফ্রান্সের জন্য বড় পরীক্ষা হতে পারে। মাঝমাঠে সুফিয়ান আমরাবাত প্রতিপক্ষের আক্রমণ থামানোর পাশাপাশি দ্রুত আক্রমণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। আক্রমণভাগে ইউসুফ এন-নেসিরির উপস্থিতি ফ্রান্সের রক্ষণকে সতর্ক থাকতে বাধ্য করবে।
এই ম্যাচে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যক্তিগত দ্বৈরথ হতে পারে এমবাপ্পে ও হাকিমির মধ্যে। একসময় একই ক্লাবে সতীর্থ ছিলেন তারা। এবার একজন প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠানোর চেষ্টা করবেন, অন্যজন চেষ্টা করবেন তাকে থামানোর। এই লড়াই ম্যাচের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মরক্কোর জন্য অবশ্য এই ম্যাচে রয়েছে পুরোনো হিসাব মেটানোর সুযোগ। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে ২-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল তারা। তবে অতীত নিয়ে ভাবতে চান না মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওহাবি। তার লক্ষ্য বর্তমান ম্যাচে সেরা পারফরম্যান্স দেওয়া।
ওহাবি বলেছেন, ফ্রান্স নিঃসন্দেহে শক্তিশালী দল। কিন্তু জয় পাওয়ার জন্য মরক্কো নিজেদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। দলটি বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন নিয়েই মাঠে নামছে এবং কোনো ম্যাচকে সহজভাবে দেখছে না।
ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশমও মরক্কোকে নিয়ে সতর্ক। তার মতে, এই পর্যায়ে আসা কোনো দলকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। সেমিফাইনালে যেতে হলে নিজেদের সেরা ফুটবলই খেলতে হবে ফ্রান্সকে।
কৌশলগতভাবে ম্যাচটি হতে পারে দুই ভিন্ন ধরনের ফুটবলের লড়াই। ফ্রান্স বল দখলে রেখে আক্রমণের গতি বাড়াতে চাইবে। দুই প্রান্ত দিয়ে আক্রমণ তৈরি করে মরক্কোর রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করবে তারা। বিপরীতে মরক্কো অপেক্ষা করবে প্রতিপক্ষের ভুলের জন্য। বল দখলে নেওয়ার পর দ্রুত পাল্টা আক্রমণই হবে তাদের প্রধান অস্ত্র।
প্রথমার্ধে যদি ফ্রান্স গোল আদায় করতে না পারে, তাহলে ম্যাচের চাপ ধীরে ধীরে তাদের ওপর বাড়তে পারে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রস্তুত থাকবে মরক্কো।
শেষ বাঁশির পর একটি দল পৌঁছে যাবে স্বপ্নের আরও কাছে, অন্য দলকে নিতে হবে বিদায়ের কষ্ট। কিন্তু ফল যাই হোক, এই ম্যাচ বিশ্বকাপের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকার মতো এক ফুটবল গল্প উপহার দিতে পারে।
মন্তব্য