খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ৭:১১ পিএম

ভারতের আইটি নগরী বেঙ্গালুরুতে মাত্র ১১ মাস বয়সি এক কন্যাসন্তানকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ও আছাড় মেরে হত্যার পর ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল স্বয়ং তার জন্মদাতা বাবা-মা। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। পুলিশের তীক্ষ্ণ তদন্ত ও ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জেরে ফেঁসে গেছেন তারা। সন্তান হত্যার দায়ে পুলিশ অভিযুক্ত বাবা ও মাকে গ্রেফতার করেছে। সোমবার (৬ জুলাই) স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়।
হৃদয়বিদারক ও নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে গত ৯ জুন পূর্ব বেঙ্গালুরুর আভালাহাল্লি থানা এলাকার কিতাগানুর গ্রামে। ঘটনার পরপরই শিশুটির বাবা শেকিয়াপ্পা থানায় গিয়ে পুলিশের কাছে দাবি করেছিলেন, তার স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মী বিছানায় শুয়ে শিশুকে স্তন্যপান করানোর সময় হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েন। ঠিক ওই অসতর্ক মুহূর্তে শিশুটি খাট থেকে নিচে পড়ে যায় এবং মাথায় চোট পেয়ে মারা যায়। খাট থেকে পড়ে যাওয়ার পর শিশুটিকে দ্রুত কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান শেকিয়াপ্পা। তার এই সুচতুর বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে পুলিশ প্রাথমিকভাবে একটি সাধারণ অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে।
পুলিশের সুরতহাল ও তদন্তের গতি বদলে যায় গত ২২ জুন ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পর। চিকিৎসকদের দেওয়া সেই রিপোর্টে এক হাড়হিম করা সত্য উন্মোচিত হয়। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করেন, খাট থেকে পড়ে সাধারণ কোনো আঘাতে এই মৃত্যু হয়নি। বরং একাধিক অভ্যন্তরীণ গুরুতর আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক জটিলতায় শিশুটি মারা গেছে। আরও ভীতিজাগানিয়া তথ্য হলো, শিশুটির মুখ, বুক, পা এবং গোপনাঙ্গে অসংখ্য পুরনো ও নতুন আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়, যা দীর্ঘদিনের নির্যাতনের ইঙ্গিত দেয়।
এই রিপোর্ট পাওয়ার পর তদন্তকারীরা পুনরায় ঘটনাস্থল কিতাগানুর গ্রামের সেই বাড়িতে যান। তারা মেপে দেখেন যে, যে খাট থেকে শিশুটি পড়ে গেছে বলে দাবি করা হয়েছিল, তার উচ্চতা ছিল মাত্র দুই ফুট। মেঝেতে কোনো ধারালো বা শক্ত পাথরও ছিল না। পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, মাত্র দুই ফুট উচ্চতার খাট থেকে পড়ে গিয়ে একটি শিশুর শরীরে এত মারাত্মক রকমের একাধিক অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও ক্ষত তৈরি হওয়া কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয়।
এর পর শুরু হয় পুলিশি কায়দায় জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রতিবেশীদের জবানবন্দি নেওয়া। তাতেই বেরিয়ে আসে আসল সত্য। ঘটনার দিন অর্থাৎ ৯ জুন দুপুরে শেকিয়াপ্পা যখন দুপুরের খাবার খেতে কর্মস্থল থেকে বাড়িতে আসেন, তখন কোনো একটি পারিবারিক বিষয় নিয়ে স্ত্রী বিজয়লক্ষ্মীর সঙ্গে তার তীব্র কথা কাটাকাটি শুরু হয়। ঝগড়া যখন চরমে পৌঁছায়, তখন ভয়ে ও চিৎকারে ১১ মাসের শিশুটি কাঁদতে শুরু করে। ঝগড়ার মাঝে শিশুর এই কান্না সহ্য করতে না পেরে চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মা বিজয়লক্ষ্মী। তিনি প্রথমে শিশুটিকে সজোরে একটি লাথি মারেন। স্ত্রীর এমন আচরণ দেখে পাশে থাকা বাবা শেকিয়াপ্পাও ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি রাগের মাথায় শিশুটিকে কোলে তুলে নিয়ে ঘরের মেঝেতে সজোরে আছাড় মারেন। এর ফলেই শিশুটির মাথা ও শরীরের ভেতর মারাত্মক অভ্যন্তরীণ আঘাত লাগে এবং সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
তদন্তে প্রতিবেশীরা পুলিশকে জানিয়েছেন, এই দম্পতির মধ্যে প্রায় প্রতিদিনই তীব্র ঝগড়া-বিবাদ লেগে থাকত। সাক্ষীদের দাবি, মা বিজয়লক্ষ্মীর এক প্রতিবেশীর সঙ্গে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এবং নিজের জন্ম দেওয়া এই কন্যাসন্তানের প্রতি তার কোনো স্নেহ-মমতা বা দেখভালের আগ্রহ ছিল না। প্রায়ই শিশুটিকে মারধর করা হতো।
চিকিৎসাগত অকাট্য প্রমাণ, প্রতিবেশীদের জবানবন্দি এবং পারিপার্শ্বিক তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে আভালাহাল্লি থানা পুলিশ অবশেষে বাবা শেকিয়াপ্পা এবং মা বিজয়লক্ষ্মীর বিরুদ্ধে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’ (BNS)-এর ধারা ১০৩(১) এবং ধারা ৩(৫) অনুযায়ী একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছে। এই নির্মম ঘটনার বিষয়ে পরবর্তী কঠোর আইনি তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে।
মন্তব্য