জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ই জুলাই ২০২৬, ১১:৪৪ এএম

পারস্য উপসাগরের কৌশলগত প্রবেশদ্বার ও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে আবারও একটি তেলবাহী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওমান উপকূলের অদূরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় গত সোমবার ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাতে একটি তেলের ট্যাংকারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা (ইউকেএমটিও) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি ঘোষিত যুদ্ধবিরতি এবং একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যখন পর্দার আড়ালে নিবিড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে, ঠিক তখনই এই আকস্মিক হামলার ঘটনা ঘটল। বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ যে জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেখানে নতুন করে এই হামলা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশন্স (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের উপকূলীয় এলাকা লিমাহ থেকে মাত্র ৮ নটিক্যাল মাইল পূর্ব দিকে হরমুজ প্রণালির মূল করিডরে এই হামলার ঘটনা ঘটে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, একটি বাণিজ্যিক ট্যাংকারের বাঁ পাশে (পোর্ট সাইড) অজ্ঞাত কোনো উড়ন্ত বস্তু বা ড্রোন আঘাত হানে এবং এর পরপরই জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী এই ঘটনায় কোনো নাবিক হতাহত হননি এবং সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার মতো কোনো বড় পরিবেশগত বিপর্যয় বা ক্ষয়ক্ষতির খবরও পাওয়া যায়নি। ঘটনার পরপরই আন্তর্জাতিক নৌবাহিনীগুলো ওই অঞ্চলে তাদের নজরদারি বাড়িয়েছে। এই নাশকতার পেছনে কার হাত রয়েছে তা উদঘাটনে ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউকেএমটিও এই রুটে চলাচলকারী সমস্ত জাহাজকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার এবং যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড অবিলম্বে কন্ট্রোল রুমে রিপোর্ট করার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে।
সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিটি বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও সামরিক উত্তেজনার মূল থিয়েটারে পরিণত হয়। সংঘাতের শুরুর দিনগুলোতেই ইরান এই আন্তর্জাতিক জলপথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ (ব্লকেড) করে দেয়। সেই সময়ে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ একের পর এক হামলার শিকার হয়, যার ফলে এই প্রণালি দিয়ে সাধারণ নৌযান চলাচল কার্যত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এর একটি বড় ধাক্কা লাগে বিশ্ব অর্থনীতিতে; আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম রাতারাতি রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। তেহরানের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের প্রধান বন্দরগুলোর ওপর কঠোর নৌ অবরোধ আরোপ করে এবং দেশটির সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে একাধিক প্রতিশোধমূলক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে এবং বিশ্ব অর্থনীতির স্বার্থে এই কৌশলগত নৌপথটি পুনরায় সচল করার লক্ষ্যে গত মাসে ওয়াশিংটন ও তেহরান একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকে (MoU) স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির পর থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিল। তবে ইরান শুরু থেকেই জোরালোভাবে সতর্ক করে আসছে যে, যুদ্ধপূর্ববর্তী অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় তারা আর ফিরে যাবে না। বর্তমানে তেহরান তাদের নিজস্ব উপকূল বরাবর একটি কঠোর ‘অনুমোদিত নির্ধারিত করিডর’ তৈরি করেছে এবং আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলোকে হুশিয়ার করে দিয়েছে যে, এই নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে অন্য কোনো রুট ব্যবহার করলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি করিডর হিসেবে হরমুজ প্রণালির ওপর আন্তর্জাতিক বাজারের নির্ভরতা অপরিসীম। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) সর্বশেষ পরিসংখ্যান এবং বাজার বিশ্লেষণ থেকে এই জলপথের কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা যায়। নিচে হরমুজ প্রণালির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবের মূল সূচকগুলো একটি তালিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সূচকসমূহ | পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট তথ্য |
| ১ | বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অবদান | মোট তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ |
| ২ | ২০২৪ সালে দৈনিক গড় তেল পরিবহন | প্রায় ২ কোটি (২০ মিলিয়ন) ব্যারেল |
| ৩ | বার্ষিক বাণিজ্যের আনুমানিক আর্থিক মূল্য | প্রায় ৬০ হাজার কোটি ডলার |
| ৪ | এশিয়ার বাজারে জ্বালানি রপ্তানির হার | মোট পরিবাহিত জীবাশ্ম জ্বালানির ৮২ শতাংশ |
| ৫ | চীনের একক নির্ভরতা (ইরানি তেলের ক্ষেত্রে) | ইরানের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ |
| ৬ | প্রধান পারস্য উপসাগরীয় ব্যবহারকারী দেশ | সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ইরাক ও কাতার |
| ৭ | হামলার সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও দূরত্ব | ওমানের লিমাহ গ্রাম থেকে ৮ নটিক্যাল মাইল পূর্বে |
| ৮ | সাম্প্রতিক তেলের বাজার পরিস্থিতি | সংঘাতের কারণে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি |
| ৯ | আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি | ওয়াশিংটন-তেহরান যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকা সত্ত্বেও হামলা |
| ১০ | বর্তমান নৌ চলাচল বিধিমালা | ইরানের উপকূল বরাবর অনুমোদিত করিডর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা |
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান প্রধান খনিজ তেল উৎপাদনকারী দেশ যেমন—সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, ইরাক এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) তাদের উৎপাদিত জ্বালানি বিশ্ববাজারে, বিশেষ করে জ্বালানি-ক্ষুধার্ত এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে (যেমন চীন, জাপান ও ভারত) পাঠানোর জন্য সম্পূর্ণভাবে এই সংকীর্ণ জলপথের ওপর নির্ভর করে। ফলে, শান্তিচুক্তি ও যুদ্ধবিরতির মধ্যেও এই ধরনের চোরাগোপ্তা হামলা আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই লাইফলাইনটিকে সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সচল রাখা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কতটা জটিল ও অনিশ্চিত।
মন্তব্য