খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৫:৩৮ পিএম

জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা অনেকের জীবনের পথকে কঠিন করে তোলে। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় এবং পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকলে সেই সীমাবদ্ধতাই একসময় পরিণত হয় অনুপ্রেরণার গল্পে। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের ১৮ বছর বয়সী পলি রানী সেই বাস্তব উদাহরণ। জন্ম থেকেই দুই হাতের আঙুল না থাকলেও তিনি কখনো নিজের স্বপ্নকে থামতে দেননি। দীর্ঘদিনের নিরলস অনুশীলনে ডান পাকে লেখার মাধ্যম হিসেবে গড়ে তুলে এবার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।
পলি রানী কাউনিয়া উপজেলার গদাই গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রয়াত মনোরঞ্জন রায়ের কন্যা। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট পলি। বড় দুই ভাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর সীমিত আয়ের মধ্যেও তিন সন্তানকে মানুষ করতে নিরলস সংগ্রাম করে যাচ্ছেন মা রুপালী রানী। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি মেয়ের শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে অনেকেই তার পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মা কিংবা মেয়ে—কেউই সেই পরামর্শে ভেঙে পড়েননি। বরং শুরু থেকেই তাদের বিশ্বাস ছিল, শিক্ষাই পলির জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে।
বর্তমানে পলি কাউনিয়া সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। পাশের কাউনিয়া মহিলা কলেজ কেন্দ্রে তিনি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থী হিসেবে পরীক্ষাকেন্দ্রে তার জন্য শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পরীক্ষার সময় তাকে অতিরিক্ত ৩০ মিনিট দেওয়া হচ্ছে, যাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে উত্তরপত্র সম্পন্ন করতে পারেন। পাশাপাশি পরীক্ষা শেষে তার উত্তরপত্র নির্ধারিত নিয়মে সংরক্ষণ করে বোর্ডে পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
পলির মা রুপালী রানী জানান, জন্ম থেকেই মেয়ের দুই হাতের আঙুল ছিল না। হাত ছোট ও বাঁকা হওয়ায় কোনোভাবেই কলম ধরা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই পলি নিজের ডান পা দিয়ে লেখার চেষ্টা শুরু করে। প্রথমদিকে একটি অক্ষর লিখতেও তাকে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হতো। প্রতিদিন নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে সেই কঠিন কাজই তার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। এখন তার লেখা এতটাই পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর যে অনেকেই বুঝতে পারেন না, সেটি হাতে নয়, পা দিয়ে লেখা।
পলির শিক্ষাজীবনের শুরুটাও ছিল নানা বাধা-বিপত্তিতে ভরা। গ্রামের অনেকেই তার সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে কেন্দ্র করে কটু মন্তব্য, অবহেলা এবং উপহাসও সহ্য করতে হয়েছে। বিদ্যালয়ের কিছু সহপাঠীর আচরণ তাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিলেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। প্রতিবারই মায়ের সাহস, শিক্ষকদের উৎসাহ এবং নিজের দৃঢ় মনোবল তাকে নতুন করে এগিয়ে চলার শক্তি দিয়েছে।
শিক্ষাজীবনে পলি বরাবরই মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় তিনি এ গ্রেড অর্জন করেন। পরে কাউনিয়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষাতেও এ গ্রেড নিয়ে উত্তীর্ণ হন। পরিবারের সদস্যরা আশা করছেন, এবার এইচএসসিতেও তিনি ভালো ফল করবেন এবং ভবিষ্যতের উচ্চশিক্ষার পথ আরও সুগম হবে।
সোমবারের পরীক্ষা শেষে পলি জানান, তার সবগুলো পরীক্ষা সন্তোষজনক হচ্ছে। তিনি কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনের ব্যাপারে আশাবাদী। ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে চান। লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করাই তার লক্ষ্য। বিশেষ করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে সমাজের মানুষের কল্যাণে কাজ করার স্বপ্ন তিনি লালন করছেন।
পলির ভাষায়, তিনি কখনো নিজেকে অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে ভাবেননি। শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে তিনি জীবনের বাধা নয়, বরং নতুনভাবে নিজেকে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। নিজের পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের ওপর ভরসা রেখেই তিনি প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করছেন।
কাউনিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম বলেন, পলি অত্যন্ত মেধাবী, পরিশ্রমী এবং আত্মবিশ্বাসী একজন শিক্ষার্থী। তিনি কখনো নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেননি। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী পরীক্ষাকেন্দ্রে তার জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে। তার সাফল্য অন্য শিক্ষার্থীদেরও সাহস ও অনুপ্রেরণা জোগাবে।
কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, স্বপ্ন, সাহস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে প্রতিকূল পরিস্থিতিও জয় করা সম্ভব। পলি সেই সত্যের জীবন্ত উদাহরণ। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন পরীক্ষার্থী হিসেবে তিনি যেন নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পারেন, সে জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
পলি রানীর জীবনসংগ্রাম কেবল একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস, পারিবারিক সমর্থন এবং শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তার পথচলা প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের সম্ভাবনাকে আটকে রাখতে পারে না। দৃঢ় সংকল্প, কঠোর পরিশ্রম এবং স্বপ্নপূরণের অদম্য ইচ্ছা থাকলে প্রতিকূলতার দেয়াল ভেঙে সাফল্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা সম্ভব।
মন্তব্য