খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ৫:৫৫ পিএম

ভেনেজুয়েলায় পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি, অবকাঠামোগত ধ্বংস এবং অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুর্যোগের প্রাথমিক মূল্যায়ন বলছে, ক্ষতির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে সীমিত বীমা কাভারেজের কারণে দেশটির বীমা খাত এবং আন্তর্জাতিক পুনঃবীমা বাজারেও চাপ বাড়ছে।
ঘটনার শুরুতে ৭.২ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এর মাত্র ৪০ সেকেন্ডেরও কম সময় পরে ৭.৫ মাত্রার আরেকটি কম্পন অনুভূত হয়। অল্প ব্যবধানে দুটি বড় ভূমিকম্প হওয়ায় উদ্ধারকাজ শুরুর আগেই বহু এলাকায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। অনেক স্থাপনায় প্রথম কম্পনে ফাটল ধরার পর দ্বিতীয় কম্পনে সেগুলো সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধসে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এটি ছিল অগভীর স্ট্রাইক-স্লিপ ধরনের ভূমিকম্প। এ ধরনের ভূমিকম্পে ভূগর্ভে সঞ্চিত শক্তি খুব দ্রুত ভূপৃষ্ঠে পৌঁছে যায়, ফলে জনবসতি ও অবকাঠামোর ওপর ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি হয়। মূল ভূমিকম্পের পর শতাধিক আফটারশকও রেকর্ড করা হয়েছে। এসব পরাঘাত উদ্ধারকর্মীদের কাজকে জটিল করে তুলেছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্কের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, এই দুর্যোগে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। তবে সেই ক্ষতির কত অংশ বীমার আওতায় রয়েছে, তা এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। এই অনিশ্চয়তা শুধু ভেনেজুয়েলার বীমা খাতেই নয়, আন্তর্জাতিক পুনঃবীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি ভবন বিভিন্ন মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে রয়েছে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল, সড়ক, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পানি অবকাঠামো। রাজধানী কারাকাসের পাশাপাশি লা গুয়াইরা, পুয়ের্তো কাবেয়ো, ভ্যালেন্সিয়া এবং পেতারে এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মানবিক পরিস্থিতিও ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৯০০ থেকে ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি হতে পারে। আহতের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং অনেক মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্যোগের প্রভাবে প্রায় ৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন মানুষ জরুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। জাতিসংঘ জানিয়েছে, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এটি আরও বড় মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
ভূমিকম্পের আগেই ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অস্থিরতা এবং তেলনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন কার্যক্রমকে সীমিত করে রেখেছে। নতুন এই দুর্যোগ সেই চাপকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে পুনর্বাসন ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সরকারের সামনে বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
বীমা খাতের অবস্থাও খুব শক্তিশালী নয়। দেশে প্রায় ৩০ থেকে ৪০টি বীমা কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করলেও বাজার তুলনামূলক ছোট এবং বিচ্ছিন্ন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সুদেআসেগ কার্যক্রম তদারকি করলেও অর্থনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে খাতটির সক্ষমতা সীমিত রয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, দেশটিতে বীমা প্রবেশমাত্রা মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। ফলে বিপুলসংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কোনো বীমা সুরক্ষার আওতায় নেই।
দেশটির উল্লেখযোগ্য বীমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মারকান্তিল সেগুরোস, ম্যাপফ্রে ভেনেজুয়েলা, কারাকাস সেগুরোস এবং হোরিজোন্তে সেগুরোস। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বড় দুর্যোগের আর্থিক প্রভাব সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা সীমিত। সীমিত বীমা কভারেজ, পুনঃবীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের সঠিক মূল্যায়নের জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
এই ভূমিকম্প এখন শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি, মানবিক পরিস্থিতি এবং বীমা ব্যবস্থার সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম কত দ্রুত এগোবে, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশটির এই সংকট কাটিয়ে ওঠার ভবিষ্যৎ।
মন্তব্য