এবিএম জাকিরুল হক টিটন
প্রকাশ: ৬ই জুলাই ২০২৬, ১২:৫১ পিএম

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান বাতিঘর এবং উত্তরবঙ্গের প্রধান বিদ্যাপীঠ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) গৌরব ও সাফল্যের ৭২ বছর পূর্ণ করে ৭৩ বছরে পদার্পণ করেছে। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানটি দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এক অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থীর আবেগ, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস এবং একটি দেশের জন্মলগ্নের সাথে মিশে থাকা এই বিদ্যাপীঠের গল্পটি একই সাথে আনন্দ, বেদনা এবং চরম গৌরবের।

Table of Contents
উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ জনপদে উচ্চশিক্ষার আলো ছড়াতে ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তবে এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ইতিহাস।
প্রাথমিক পটভূমি: ১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার একটি প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। একসময় সেখানে স্নাতকোত্তর ও আইন বিভাগ চালু থাকলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব বাংলার, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার আদায়ের বিষয়টি একটি গণদাবিতে পরিণত হয়।
সংগ্রাম কমিটি গঠন: ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর স্থানীয় শিক্ষাবিদ, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও বিশিষ্ট নাগরিকদের সমন্বয়ে ৬৪ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী ‘বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করা হয়।
গণআন্দোলনে রূপান্তর: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে এই দাবি আরও বেগবান হয়। ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারির বিশাল জনসভা এই আন্দোলনকে আমজনতার দাবিতে রূপান্তর করে। এই আন্দোলনের কারণে তৎকালীন সরকারের কোপানলে পড়ে ১৫ জন প্রথম সারির ছাত্রনেতাকে কারাবরণ করতে হয়।
চূড়ান্ত স্বীকৃতি: তীব্র জনমতের মুখে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন পাকিস্তান সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ পাস হয় ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন’। এরপর একই বছরের ৬ জুলাই প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরী প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে এই ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠ।

শুরুর দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম শহরের বিভিন্ন স্থানে scattered বা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। রাজশাহী কলেজ, পদ্মার তীরবর্তী বড়কুঠি, লালকুঠি এবং ফুলার হোস্টেলসহ বিভিন্ন স্থানে এর প্রাথমিক কাজ চলত।
পরবর্তীতে অস্ট্রেলীয় প্রখ্যাত স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের একটি সুনিপুণ ও নান্দনিক মাস্টারপ্ল্যান বা পরিকল্পনায় নির্মিত হয় সবুজে ঘেরা আজকের মতিহার ক্যাম্পাস। ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্ত বিভাগ ও প্রশাসনিক কাঠামো এই মূল ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত হয়। প্যারিস রোডের গগনশিরীষ গাছের ছায়া, চিরসবুজ মতিহার চত্বর এবং মুক্তচিন্তা চর্চার এক অনন্য পরিবেশ এই ক্যাম্পাসকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং দৃষ্টিনন্দন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস শুধু শিক্ষা কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত অধিকার রক্ষা, স্বাধিকার আন্দোলন এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের এক জীবন্ত দলিল।
শহীদ ড. শামসুজ্জোহা: শিক্ষকের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ১৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি সেনাদের হাত থেকে আন্দোলনরত ছাত্রদের জীবন রক্ষা করতে নিজের বুক পেতে দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। একজন শিক্ষকের ছাত্রদের জন্য এভাবে জীবন উৎসর্গ করার ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তাঁর এই মহিমান্বিত আত্মত্যাগ তৎকালীন গণআন্দোলনে দাবানলের মতো গতি এনে দিয়েছিল, যা পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয় তার বহু শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হারিয়েছে। পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে শহীদ হন অধ্যাপক হবিবুর রহমান, অধ্যাপক সুখরঞ্জন সমাদ্দার, মীর আবদুল কাইয়ুমসহ অসংখ্য শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থী।
স্বাধীনতার পরেও স্বৈরাচারবিরোধী এবং মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে রাবি ক্যাম্পাস সবসময় অগ্রভাগে ছিল। ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নির্মমভাবে শহীদ হন মেধাবী ছাত্রনেতা ও তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ এবং হকার আব্দুল আজিজ। এই একই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর সাবেক ভিপি রুহুল কবির রিজভী। পরবর্তীতে ক্যাম্পাসকে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতামুক্ত রাখার আন্দোলনে জীবন দেন ইয়াসির আহমেদ পিটু এবং স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয় রিমুসহ অনেক ছাত্রনেতাকে।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে মতিহারের এই ক্যাম্পাস কেবল একটি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনের জায়গা নয়, বরং এটি তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়, রাজনৈতিক চেতনা ও নেতৃত্বের হাতেখড়ি পাওয়ার স্থান। প্রায় চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ ভোটে পরপর দুইবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)-এর পত্রিকা সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার মতো গৌরবময় অর্জন শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
মতিহার চত্বরের প্রতিটি ধূলিকণা, রাস্তা, আড্ডার জায়গাগুলো আজও পুরোনো শিক্ষার্থীদের মনে তারুণ্যের সেই সোনালী দিনগুলোর স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়—যেখানে ছিল স্বপ্ন, প্রতিবাদ, বন্ধুত্ব আর অমিত সম্ভাবনার হাতছানি।
৭২ বছর পেরিয়ে ৭৩ বছরে পদার্পণের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রাক্তন অ্যালামনাইদের প্রত্যাশা অনেক উঁচুতে। অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ধারণ করে এই বিদ্যাপীঠ আগামী দিনে যেন আরও এগিয়ে যায়, সেটাই সবার কাম্য। দলীয় সংকীর্ণতা, সহিংসতা, দুর্নীতি ও অপসংস্কৃতির ঊর্ধ্বে উঠে এই প্রতিষ্ঠানটি যেন মুক্তচিন্তা, আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতা, উচ্চতর গবেষণা ও নতুন নতুন উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে—৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটাই হোক প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের মূল অঙ্গীকার।
লেখকঃ
এবিএম জাকিরুল হক টিটন
সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরওয়ালা, জি-লাইভ
সাবেক পত্রিকা সম্পাদক, রাকসু।
মন্তব্য