খুলনায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই মাদক সেবনকারীকে থানা থেকে জোরপূর্বক ছাড়িয়ে নিতে এসে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন এক স্থানীয় political বা রাজনৈতিক নেতা ও তাঁর সহযোগী। গ্রেপ্তার হওয়া ওই নেতার নাম মো. মোস্তফা শেখ দুলাল, যিনি খুলনা নগরীর ১৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁর সঙ্গে গ্রেপ্তার হয়েছেন সহযোগী মো. শরিফুল ইসলাম। গত শনিবার রাতে নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় এই ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে মোস্তফা শেখ দুলালকে শ্রমিক দল থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ঘটনার মূল চরিত্র ও তাঁদের বর্তমান অবস্থা
মো. মোস্তফা শেখ দুলাল: সাধারণ সম্পাদক, ১৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দল (বর্তমানে দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত)।
অভিযোগ: মদ্যপ অবস্থায় থানায় চড়াও হওয়া, কর্তব্যরত পুলিশকে হুমকি ও গালিগালাজ।
বর্তমান অবস্থা: গ্রেপ্তার এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন।
মো. শরিফুল ইসলাম: সহযোগী ও স্থানীয় বাসিন্দা।
অভিযোগ: মদ্যপ অবস্থায় থানায় হট্টগোল সৃষ্টি ও সরকারি কাজে বাধা প্রদান।
বর্তমান অবস্থা: গ্রেপ্তার এবং খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসাধীন।
মো. পারভেজ শেখ ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ: স্থানীয় দুই যুবক।
অভিযোগ: প্রকাশ্যে মাদক সেবনরত অবস্থায় হাতেনাতে আটক।
বর্তমান অবস্থা: সোনাডাঙ্গা থানা পুলিশ হেফাজতে আটক।
সোনাডাঙ্গা থানা-পুলিশ সূত্রে জানা যায়, শনিবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে নগরীতে একটি নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালাচ্ছিল পুলিশ। ওই অভিযান চলাকালে প্রকাশ্যে মাদক সেবনরত অবস্থায় মো. পারভেজ শেখ ও মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামের দুই যুবককে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাঁদের সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় নিয়ে আসা হয়।
পুলিশের দাবি, এই ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই অর্থাৎ রাত পৌনে ১টার দিকে গ্রেপ্তার ওই দুই মাদকসেবীকে ছাড়ানোর জন্য মদ্যপ অবস্থায় থানায় চড়াও হন ওয়ার্ড শ্রমিক দলের নেতা মো. মোস্তফা শেখ দুলাল, তাঁর সহযোগী মো. শরিফুল ইসলামসহ অজ্ঞাতনামা আরও দুই-তিনজন। থানায় ঢুকেই তাঁরা পুলিশের হেফাজতে থাকা পারভেজ ও আব্দুল্লাহর সঙ্গে জোর করে সাক্ষাতের চেষ্টা চালান। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা নিয়ম মেনে তাঁদের এই সাক্ষাতে বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
একপর্যায়ে সোনাডাঙ্গা থানায় কর্মরত সহকারী পরিদর্শক (এসআই-নিরস্ত্র) নাদিম মাহমুদের কক্ষে ঢোকেন মোস্তফা শেখ দুলাল। তিনি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে গ্রেপ্তার দুই যুবককে কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেন। কিন্তু এসআই নাদিম মাহমুদ এই অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন দুলাল ও তাঁর সহযোগী শরিফুল ইসলাম। তাঁরা কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের দেখে নেওয়ার হুমকি দেন এবং চাকরিচ্যুত করার ভয় দেখিয়ে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করতে শুরু করেন। থানার ভেতরে মদ্যপ অবস্থায় এমন হট্টগোল ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অপরাধে পুলিশ তখন দুলাল ও শরিফুলকে গ্রেপ্তার করে।
থানা হেফাজতে নেওয়ার পর মোস্তফা শেখ দুলাল ও শরিফুল ইসলামের শারীরিক অবস্থার অবনতি ও অতিরিক্ত মদ্যপানের লক্ষণ দেখা দিলে পুলিশ তাঁদের চিকিৎসার উদ্যোগ নেয়। রাতেই তাঁদের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানকার প্রিজন সেলে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তাঁরা সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় পুলিশি পাহারায় রয়েছেন।
সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রফিকুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, শনিবার দিবাগত রাতে মাদক সেবনরত অবস্থায় দুজনকে গ্রেপ্তার করার পর মোস্তফা শেখ দুলাল ও তার সহযোগী শরিফুল ইসলাম থানায় এসে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করেন। তাঁরা নিজেদেই তখন চরম মদ্যপ অবস্থায় ছিলেন এবং পুলিশের সঙ্গে অত্যন্ত আপত্তিকর আচরণ করেন। সরকারি কাজে বাধা ও হুমকির মুখে তাঁদের গ্রেপ্তার করে চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে এই ঘটনার পর রাজনৈতিক দলটির পক্ষ থেকেও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। রোববার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে খুলনা মহানগর শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক মো. শরিফুল ইসলাম টিপু জানান, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়ায় মোস্তফা শেখ দুলালকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ শ্রমিক দল থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত কারোর জন্য দলে কোনো জায়গা নেই বলে তিনি স্পষ্ট জানান।









