খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৬, ৯:৫৩ পিএম

ফরিদপুরে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে মৃত্যুবরণকারী ছাত্রলীগের কর্মী মির্জা ইশতিয়াক আহমেদকে (২৮) মাদকসহ আটকের অভিযোগে দায়ের করা মামলার এজাহার ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। মামলার নথিতে উল্লেখ করা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে ভিডিওচিত্র, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সাক্ষীদের বর্ণনার একাধিক অসংগতি সামনে এসেছে। সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, আটকের সময় লুঙ্গি পরা ইশতিয়াকের ‘প্যান্টের ডান পকেট’ থেকে ১০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের দাবি।
গত ২১ জুন ফরিদপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আহাদুজ্জামান মধুখালী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি দায়ের করেন। ওই দিনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ইশতিয়াক আহমেদ। মামলায় তাকেই একমাত্র আসামি করা হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২০ জুন দিবাগত রাত ২টা ১০ মিনিটে ডিবি পুলিশের একটি দল অভিযানে যায়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ইশতিয়াক পালানোর চেষ্টা করলে তাকে আটক করা হয়। পরে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি নিজের কাছে গাঁজা থাকার কথা স্বীকার করেন এবং প্যান্টের ডান পকেট থেকে পলিথিনে মোড়ানো ১০০ গ্রাম গাঁজা বের করে পুলিশের হাতে তুলে দেন।
কিন্তু এই বিবরণের সঙ্গে ঘটনাস্থলের ভিডিওচিত্রের মিল পাওয়া যায় না। ২০ জুন বিকেল প্রায় ৫টার দিকে ঢাকা–খুলনা মহাসড়কের মধুখালী পৌরসভার পশ্চিম গোন্দারদিয়া এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে থেকে ইশতিয়াককে আটক করা হয়। পরে সেই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে স্পষ্ট দেখা যায়, ঘটনাটি দিনের আলোয় ঘটেছে। তখন ইশতিয়াকের পরনে ছিল লুঙ্গি ও জামা, কাঁধে ছিল একটি ল্যাপটপ ব্যাগ। ভিডিওতে আরও দেখা যায়, পুলিশ সদস্যরা তাঁর শরীর তল্লাশি করছেন এবং কয়েকজন সদস্য তাকে চড় মারছেন। একপর্যায়ে ইশতিয়াকের অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে পড়ে থাকা একটি বস্তু দেখিয়ে একজন পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘এই যে এক পোঁটলা।’
মামলার দুই সাক্ষীর বক্তব্যও এজাহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাক্ষী মো. আলমগীর হোসেন বলেন, পুলিশ যে স্থানকে ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করেছে, তিনি সেখানে ছিলেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ জুন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তিনি মধুখালী মরিচ বাজারে আরেক সাক্ষী ব্যবসায়ী বিনয় কুমার সাহার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সে সময় মোটরসাইকেলে কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে তাঁর পরিচয়, ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বর লিখে নেন। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁকে মাদক মামলার সাক্ষী করা হয়েছে।
অন্য সাক্ষী বিনয় কুমার সাহার সঙ্গে যোগাযোগ করা না গেলেও তাঁর ছেলে বাঁধন সাহা জানান, ঘটনার সময় তাঁর বাবা মরিচ বাজারের ভেতরে নিজেদের দোকানে ছিলেন, যা আটকের স্থান থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে। তাঁর দাবি, পরে পুলিশ এসে সাক্ষী হওয়ার অনুরোধ জানালে তাঁর বাবা তাতে রাজি হননি। এরপরও জোর করে একটি কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
মামলার নথিতে আরও বলা হয়েছে, উদ্ধার করা কথিত ১০০ গ্রাম গাঁজা থেকে পাঁচ গ্রাম রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং অবশিষ্ট অংশ আলামত হিসেবে জমা দেওয়া হয়। তবে রাসায়নিক পরীক্ষার আগে বস্তুটি প্রকৃতপক্ষে গাঁজা কি না, তা নিশ্চিত না হলেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।
এজাহারের এসব অসংগতি নিয়ে জানতে চাইলে মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুকদেব রায় বলেন, এজাহারটি গোয়েন্দা পুলিশ প্রস্তুত করে থানায় জমা দিয়েছে। থানা সেটিকে ২১ জুন সকাল সোয়া ৬টার দিকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করেছে। এজাহারের ভাষা বা বিবরণে থানার কোনো ভূমিকা ছিল না। ডিবি পুলিশ যেভাবে লিখে দিয়েছে, সেভাবেই মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, উদ্ধার হওয়া কোনো বস্তু প্রাথমিকভাবে মাদকসদৃশ মনে হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা নেওয়া হয়ে থাকে। পরে রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদনে সেটি মাদক হিসেবে প্রমাণিত না হলে সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলার পরবর্তী আইনগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মামলার এজাহারে উল্লেখিত সময়, ঘটনাস্থল, সাক্ষীদের উপস্থিতি এবং মাদক উদ্ধারের বর্ণনার সঙ্গে ভিডিওচিত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের যে অসামঞ্জস্য দেখা গেছে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এসব অসংগতি তদন্তে কীভাবে মূল্যায়িত হবে এবং মামলার ভবিষ্যৎ গতিপথ কী হবে, তা এখন তদন্তকারী সংস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
মন্তব্য