জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: প্রতিষ্ঠা আন্দোলন থেকে বর্তমান

 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় তার প্রতিষ্ঠার ৭২ বছর পূর্ণ করে ৭৩ বছরে পদার্পণ করেছে। লেখক এবিএম জাকিরুল হক টিটন (যিনি বর্তমানে ‘খবরওয়ালা’ ও ‘জি-লাইভ২৪’-এর সম্পাদক ও প্রকাশক এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসুর সাবেক পত্রিকা সম্পাদক) এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, ছাত্র আন্দোলন এবং ক্যাম্পাসের ক্রমবিকাশের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। লেখক নিজে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং প্রায় চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থীর প্রত্যক্ষ ভোটে পরপর দুইবার রাকসুর পত্রিকা সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন

IMG 20260705 WA0001 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: প্রতিষ্ঠা আন্দোলন থেকে বর্তমান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

পূর্ব বাংলার উত্তরাঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রসারের একটি সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, যা মূলত আন্দোলন ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাস্তবায়িত হয়েছিল:

  • প্রাথমিক সূচনা: ১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত ঘটে। একপর্যায়ে এখানে স্নাতকোত্তর ও আইন বিভাগ চালু করা হলেও পরবর্তীতে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

  • দেশভাগ ও আন্দোলনের সূত্রপাত: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জোরদার হতে থাকে।

  • সংগ্রাম কমিটি গঠন: ১৯৫০ সালের ১৫ নভেম্বর স্থানীয় শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি ৬৪ সদস্যবিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়।

  • গণআন্দোলনে রূপান্তর: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়, বিশেষ করে ৬ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং ১০ ও ১৩ ফেব্রুয়ারির জনসভা এই দাবিকে একটি ব্যাপক গণআন্দোলনে রূপ দেয়।

  • আইন পাস ও আনুষ্ঠানিক যাত্রা: আন্দোলনের জেরে ১৫ জন ছাত্রনেতাকে কারাবরণ করতে হয়। অবশেষে তীব্র জনমতের মুখে তৎকালীন সরকার নতি স্বীকার করে এবং ১৯৫৩ সালের ৩১ মার্চ ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ পাস হয়। একই বছরের ৬ জুলাই প্রফেসর ইতরাত হোসেন জুবেরী প্রথম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়টির যাত্রা শুরু হয়।

University of Rajshahi 570x500 2 রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: প্রতিষ্ঠা আন্দোলন থেকে বর্তমান

ক্যাম্পাস পরিবর্তন ও মতিহার চত্বরের বিকাশ

প্রতিষ্ঠার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বর্তমান অবস্থানে শুরু হয়নি:

  • প্রাথমিক স্থান: প্রথমদিকে রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। এরপর শহরের বিভিন্ন স্থান যেমন—পদ্মা নদীর তীরবর্তী বড়কুঠি, লালকুঠি এবং ফুলার হোস্টেলসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশাসনিক ও একাডেমিক কাজ পরিচালিত হতো।

  • স্থায়ী ক্যাম্পাস পরিকল্পনা: পরবর্তীতে অস্ট্রেলীয় স্থপতি ড. সোয়ানি টমাসের প্রণীত নকশা ও পরিকল্পনার ওপর ভিত্তি করে বর্তমানের মতিহার ক্যাম্পাসটি গড়ে তোলা হয়।

  • স্থানান্তর: ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহরের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা সকল প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে মতিহারের এই স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরিত করা হয়।

images রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী: প্রতিষ্ঠা আন্দোলন থেকে বর্তমান

ছাত্র আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক সংকট, অধিকার আদায় এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত:

  • ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান: ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রক্টর ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা নিহত হন।

  • ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ: ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ অংশ নেন এবং শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন শহীদ অধ্যাপক হবিবুর রহমান, সুখরঞ্জন সমাদ্দার এবং মীর আবদুল কাইয়ুম।

  • স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন (১৯৮৪): ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সময়ে তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ এবং হকার আব্দুল আজিজ গুলিতে নিহত হন। এই একই ঘটনায় রাকসুর সাবেক ভিপি রুহুল কবির রিজভী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন।

  • সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী আন্দোলন: পরবর্তী সময়ে সংঘটিত সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইয়াসির আহমেদ পিটু নিহত হন এবং রিমুসহ আরও কয়েকজন স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।

ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা ও লক্ষ্য

প্রতিবেদনটি অনুযায়ী, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দলীয় সংকীর্ণতা, লুটপাট, সহিংসতা, দুর্নীতি ও নেতিবাচক রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি থেকে মুক্ত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রশাসন এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের (অ্যালামনাই) সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটিকে মুক্তচিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ, বিজ্ঞানমনস্কতা, উচ্চতর গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলাই এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের মূল লক্ষ্য ও প্রত্যাশা।

লেখকঃ এবিএম জাকিরুল হক টিটন

সম্পাদক ও প্রকাশক, জি-লাইভ২৪

সাবেক পত্রিকা সম্পাদক, রাকসু।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর