খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ই জুলাই ২০২৬, ১২:১৭ এএম

বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনার মধ্যেও গত কয়েক মাস ক্রিকেট দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত নাম ছিল ১৫ বছর বয়সী ভারতীয় ব্যাটার বৈভব সূর্যবংশী। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের আগেই তিনি এমন এক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিলেন, যা সাধারণত প্রতিষ্ঠিত তারকাদের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। আইপিএলে বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে নজর কাড়ার পর জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন এই কিশোর। কিন্তু আয়ারল্যান্ড সফরের দুটি টি-টোয়েন্টি এবং পরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচে একাদশে সুযোগ না পাওয়ায় শুরু হয় তুমুল আলোচনা।
ক্রিকেট বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাবেক তারকা—অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, এত প্রতিভাবান একজন ব্যাটারকে কেন বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হচ্ছে। যারা আইপিএলে তার ব্যাটিং দেখেছেন, তাদের কাছে বিষয়টি আরও বিস্ময়কর ছিল। তবে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট শুরু থেকেই জানিয়ে আসছিল, প্রতিভার পাশাপাশি দলের ভারসাম্য, অভিজ্ঞতা এবং সময়ও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অবশেষে সব অপেক্ষার অবসান ঘটে শনিবার ম্যানচেস্টারের ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টিতে ভারতের জার্সিতে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় বৈভব সূর্যবংশীর। মাত্র ১৫ বছর ৯৯ দিন বয়সে মাঠে নেমে তিনি ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের রেকর্ড গড়েন। এতদিন এই রেকর্ডটি ছিল শচীন টেন্ডুলকারের দখলে। ১৯৮৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের সময় শচীনের বয়স ছিল ১৬ বছর ২০৫ দিন। ঐতিহাসিক সেই ওল্ড ট্র্যাফোর্ডেই ভারতের সহ-অধিনায়ক তিলক ভার্মার হাত থেকে অভিষেক ক্যাপ গ্রহণ করেন বৈভব।
তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। কারণ ভারতের টপ অর্ডারে আগে থেকেই জায়গা দখল করে ছিলেন দুর্দান্ত ফর্মে থাকা তিন ব্যাটার। ওপেনার অভিষেক শর্মা টি-টোয়েন্টি র্যাঙ্কিংয়ের দুই নম্বরে, ঈশান কিশান এক নম্বরে এবং সঞ্জু স্যামসনও সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্সে নির্বাচকদের আস্থা অর্জন করেছিলেন। ফলে বৈভবকে সুযোগ দিতে হলে কাউকে না কাউকে জায়গা ছাড়তেই হতো।
শেষ পর্যন্ত টানা তিন ইনিংসে ৫, ০ ও ১ রান করার পর একাদশ থেকে বাদ পড়েন সঞ্জু স্যামসন। তার জায়গাতেই সুযোগ পান বৈভব। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যেমন সমালোচনা হয়েছিল, তেমনি ভবিষ্যতের কথা ভেবে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসাও কুড়িয়েছে ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্ট।
গত কয়েক দিন ধরে বৈভবকে না খেলানো নিয়ে বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে কোচিং স্টাফকে। সহকারী কোচ রায়ান টেন ডেসকাটে বলেছিলেন, অন্য সবার মতো বৈভবকেও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। তার এই মন্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়।
টসের পর অধিনায়ক শ্রেয়াস আইয়ারও বৈভবকে নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, গত কয়েক মাসে নেটে এবং প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে বৈভব যেভাবে ব্যাটিং করেছে, তাতে তার সামর্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আইয়ারের মতে, বৈভব এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি চাপকে ভয় পান না। বরং বড় মঞ্চে নিজের সেরাটা বের করে আনতে প্রস্তুত থাকেন। তিনি আরও বলেন, ভারতের ক্রিকেট কাঠামো থেকে নিয়মিত নতুন প্রতিভা উঠে আসছে, যা দলের ভেতরে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা তৈরি করছে।
বৈভবকে ঘিরে এত আলোচনার পেছনে রয়েছে তার অসাধারণ পরিসংখ্যান। সর্বশেষ আইপিএলে তিনি ২৩৭.৩০ স্ট্রাইক রেটে ৭৭৬ রান করেন এবং ৭২টি ছক্কা হাঁকিয়ে টুর্নামেন্টে আধিপত্য বিস্তার করেন। এই পারফরম্যান্সের সুবাদে তিনি মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার, অরেঞ্জ ক্যাপ, ইমার্জিং প্লেয়ার, সুপার স্ট্রাইকার এবং সুপার সিক্সেস—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার জেতেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই ছক্কার রেকর্ডে তিনি ক্রিস গেইলের মতো কিংবদন্তিকেও ছাড়িয়ে যান।
আইপিএলের পর ভারত ‘এ’ দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা সফরেও নিজেকে প্রমাণ করেন বৈভব। ত্রিদেশীয় সিরিজে পাঁচ ইনিংসে করেন ২১১ রান। ফাইনালে খেলেন ৯৪ রানের ঝড়ো ইনিংস। একই সফরে শ্রীলঙ্কা ‘এ’ দলের বিপক্ষে মাত্র ১১ বলে অর্ধশতক করে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটের দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড গড়েন।
শুধু টি-টোয়েন্টি নয়, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট, লিস্ট ‘এ’, যুব টেস্ট, যুব ওয়ানডে এবং অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ—সব সংস্করণেই তার ব্যাট ধারাবাহিকভাবে কথা বলেছে। অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ৪৩৯ রান করে দলকে শিরোপা জেতানোর কৃতিত্বও রয়েছে তার ঝুলিতে। এসব পরিসংখ্যানই তাকে ভারতের ক্রিকেটের সবচেয়ে উজ্জ্বল সম্ভাবনাগুলোর একটিতে পরিণত করেছে।
তবে বহুল প্রতীক্ষিত আন্তর্জাতিক অভিষেকে প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ করতে পারেননি বৈভব। ১০ বলে দুটি ছক্কায় ১৪ রান করে ফিরতে হয়েছে তাকে। ইনিংসটি বড় না হলেও তার আত্মবিশ্বাসী ব্যাটিং এবং স্বাভাবিক মানসিকতা ভবিষ্যতের জন্য ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের এই অভিষেক তাই শুধু একটি নতুন রেকর্ডের গল্প নয়; এটি ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন সম্ভাবনারও সূচনা। যে মাঠে একসময় শচীন টেন্ডুলকার নিজের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেছিলেন, সেই মাঠেই সর্বকনিষ্ঠ ভারতীয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন বৈভব সূর্যবংশী।
তবে বয়সে শচীনকে ছাড়িয়ে যাওয়াই শেষ কথা নয়। ২৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে শচীন টেন্ডুলকার ৬৬৪টি ম্যাচ খেলে করেছেন ৩৪ হাজার ৩৫৭ রান এবং গড়েছেন ১০০ আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির অবিশ্বাস্য রেকর্ড। বৈভবের পথ এখনও অনেক দীর্ঘ। প্রতিভার ঝলক তিনি দেখিয়েছেন, এখন সেই প্রতিভাকে ধারাবাহিক সাফল্যে রূপ দেওয়াই হবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রিকেটপ্রেমীরাও এখন অপেক্ষায়—এই নতুন প্রতিভা ভবিষ্যতে ভারতীয় ক্রিকেটকে কতটা সমৃদ্ধ করতে পারেন।
মন্তব্য