জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৬, ১২:২৫ পিএম

পাবনার ভাঙ্গুড়ায় নাশকতার সন্দেহে এক সাবেক যুবলীগ নেতাকে আটক করার পর স্থানীয় জনরোষের মুখে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে পুলিশ। আটকের খবর ছড়িয়ে পড়লে প্রায় তিন শতাধিক বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী ভাঙ্গুড়া থানা ঘেরাও করে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে অবরুদ্ধ পুলিশ প্রশাসন ও গ্রামবাসীর প্রতিনিধিদের মধ্যে এক জরুরি বৈঠক শেষে আটককৃত নেতাকে স্বজন ও গ্রামবাসীদের জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়।
শুক্রবার (৩ জুলাই) রাত সাড়ে ১০টার দিকে ভাঙ্গুড়া থানা চত্বরে এই নজিরবিহীন ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। আটক ও পরবর্তীতে মুক্তি পাওয়া ওই নেতার নাম রিপন সরকার (৪০)। তিনি পাবনার ভাঙ্গুড়া উপজেলার পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের পাটুলিপাড়া গ্রামের হাবিবুর সরকারের ছেলে এবং পার-ভাঙ্গুড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি।
Table of Contents
ভাঙ্গুড়া থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে ভাঙ্গুড়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আরিফুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল পাটুলিপাড়া গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় সাম্প্রতিক বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে রিপন সরকারকে আটক করে থানায় নিয়ে আসা হয়। তবে রিপন সরকারের মতো একজন পরিচিত স্থানীয় নেতাকে আকস্মিক ও বিনা ওয়ারেন্টে আটকে সাধারণ গ্রামবাসীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এই আটকের ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক কোনো কারণ নেই, বরং এর মূল সূত্রপাত ঘটেছে একটি স্থানীয় বাজারের জায়গা সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের বিরোধ থেকে। টেবুনিয়া-বাঘাবাড়ী আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন পাটুলিপাড়া গ্রামের একটি মূল্যবান সরকারি খাসজমি ও স্থানীয় ছোট বাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ গ্রামবাসীদের সাথে ইউনুস সরকার নামে এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরোধ চলছিল।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, সরকারি ওই জায়গাটি অবৈধভাবে দখল করে ইউনুস সরকার সেখানে একটি পাকা ঘর নির্মাণ করেছিলেন। কিছুদিন আগে সর্বস্তরের গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে সেই অবৈধ স্থাপনাটি ভেঙে ফেলেন। পরবর্তীতে সেখানে নতুন করে মাছের বাজার বসানো হয় এবং স্থানটিকে ‘ছোট বাজার ও অটোরিকশা স্ট্যান্ড’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে একটি ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার পর ইউনুস সরকার জায়গাটি নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি দাবি করে এবং রিপন সরকারসহ গ্রামের কয়েকজন অগ্রণী ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে ভাঙ্গুড়া থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। গ্রামবাসীদের দাবি, রিপন সরকার এই ভূমি রক্ষায় সাধারণ মানুষের পক্ষে অত্যন্ত জোরালো ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছিলেন। মূলত জনগণের এই ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে স্তিমিত করতে এবং রিপন সরকারকে ব্যক্তিগতভাবে হয়রানি করার উদ্দেশ্যেই ইউনুস সরকারের মিথ্যা ও সাজানো অভিযোগে পুলিশ এই আটক অভিযান চালিয়েছে।
রিপন সরকারকে আটকের খবরটি গ্রামে পৌঁছানো মাত্রই ক্ষোভে ফেটে পড়েন পাটুলিপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা। মুহূর্তের মধ্যে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় ৩০০ গ্রামবাসী লাঠিসোটা ও স্লোগান সহকারে ভাঙ্গুড়া থানা ঘেরাও করেন। তারা থানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে রিপন সরকারের তাৎক্ষণিক ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ বিক্ষোভকারীদের মূল চত্বর থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে দেয়।
উত্তেজনাপূর্ণ এই পরিস্থিতিতে ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আজম বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশ্যে বলেন,
“আমি যুবলীগের সভাপতিকে নিয়ে এসেছি। আপনারা কেন এসেছেন? আপনারা কি মব (Mob) করতে চান? এই মুহূর্তে থানা এলাকা ছেড়ে চলে যান।”
তিনি আরও দাবি করেন যে, তিনি আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেতার সাথে কথা বলেছেন এবং নিশ্চিত হয়েছেন যে রিপন দলটির চলমান কমিটির একজন সক্রিয় সভাপতি। ওসির এই বক্তব্যে উপস্থিত গ্রামবাসীদের ক্ষোভ আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
গ্রামবাসীদের অনড় অবস্থান ও ক্রমাগত বাড়তে থাকা উত্তেজনার মুখে একপর্যায়ে নমনীয় অবস্থান নেয় থানা প্রশাসন। পরিস্থিতি শান্ত করতে বিক্ষোভকারীদের মধ্য থেকে শীর্ষ ৫ জন স্থানীয় প্রতিনিধিকে ওসির কক্ষে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। ওসির কক্ষে উভয় পক্ষের দীর্ঘ আলোচনার পর, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা এবং রিপন সরকারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ না থাকায় তাকে গ্রামবাসীদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রতিনিধিদল রিপন সরকারকে সাথে নিয়ে থানা থেকে বের হয়ে নিজ গ্রামে ফিরে যান।
এ বিষয়ে ভাঙ্গুড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাকিউল আজম গণমাধ্যমকে জানান, মূলত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই রিপন সরকারকে থানায় আনা হয়েছিল। তবে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তার বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে স্থানীয় গ্রামবাসীদের প্রবল দাবি ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে তাকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জিম্মায় মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
মন্তব্য