খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৫:১৬ পিএম

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংঘাত নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিতে ইউক্রেন সম্প্রতি ৪০ দিনের বিশেষ সামরিক অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযানের মূল লক্ষ্য রাশিয়ার কৌশলগত সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক ড্রোন হামলা চালিয়ে মস্কোর যুদ্ধ সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ানো।
ইউক্রেনের সাম্প্রতিক হামলাগুলোতে রাশিয়ার অভ্যন্তরের তেল শোধনাগার, তেল সংরক্ষণাগার, জ্বালানি টার্মিনাল, অস্ত্র উৎপাদন কারখানা, নৌঘাঁটি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এসব হামলায় রাশিয়া কিছুটা চাপের মুখে পড়লেও প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেননি। তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসার প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছেন। বরং রুশ বাহিনীকে আরও সংগঠিত করে সামরিক অভিযান জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন।
যুদ্ধের প্রথম দিকে রাশিয়া ইউক্রেনের বিদ্যুৎকেন্দ্র, সাবস্টেশন, জ্বালানি অবকাঠামো ও তাপ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যাপক হামলা চালিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে ইউক্রেনের মনোবল দুর্বল করে দেওয়া। এখন সেই একই কৌশলের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে। ড্রোন প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে তারা রাশিয়ার অভ্যন্তরে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানছে।
এই কৌশলের প্রভাব রাশিয়ার অভ্যন্তরেও দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দীর্ঘ পাঁচ বছরের যুদ্ধ এমনিতেই দেশটির অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক হামলার পর সেই চাপ আরও বেড়েছে। জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, পরিবহন সংকট এবং শিল্প কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সংগ্রহে দীর্ঘ সারির খবরও সামনে এসেছে। দখলকৃত ক্রিমিয়ায় জ্বালানি বিক্রি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে এবং সেখানে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রথমদিকে ইউক্রেনের ড্রোন হামলাকে খুব একটা গুরুত্ব না দিলেও এখন রুশ নেতৃত্ব বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন নিজেও জ্বালানি সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে ডিজেল রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। গত সপ্তাহে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি স্বীকার করেন, দেশের জ্বালানি মজুদ স্বস্তিদায়ক অবস্থানে নেই।
একই সঙ্গে রাশিয়ার কৃষি খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পুতিন। তাঁর ভাষ্য, বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলার প্রভাব যতটা সম্ভব কমিয়ে আনতে হবে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থা সচল রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা অনেকটাই পশ্চিমা দেশগুলোর অস্ত্র ও সহায়তার ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশটি নিজস্ব ড্রোন শিল্পে বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে ইউক্রেন বছরে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লাখ ড্রোন উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। সীমান্তে সরাসরি স্থলযুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে সমানে লড়াই করা কঠিন হওয়ায় দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে গভীর অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কৌশল গ্রহণ করেছে কিয়েভ।
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক শক্তিতে রাশিয়ার সমকক্ষ না হলেও প্রযুক্তিনির্ভর ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের মাধ্যমে ইউক্রেন কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক অভিযানের ফলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। একসময় তাঁর সমালোচনায় সরব থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এখন ইউক্রেনের প্রতিরোধ সক্ষমতার প্রশংসা করছেন। একই সঙ্গে ন্যাটোর পক্ষ থেকেও ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
জেলেনস্কি বলেছেন, প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব, যেখানে রাশিয়া শেষ পর্যন্ত শান্তির পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে।
তবে ইউক্রেনের ড্রোন কৌশল রাশিয়াকে তাৎক্ষণিকভাবে নতি স্বীকার করাবে—এমন ধারণা অনেক বিশ্লেষকই সমর্থন করেন না। তাদের মতে, পুতিন দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার রাজনৈতিক, সামরিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর দৃঢ় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। ফলে বাহ্যিক চাপের মুখে তাঁর অবস্থান বদলানোর সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
এদিকে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও গ্লাইড বোমা হামলা অব্যাহত রেখেছে। এসব হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। ফলে যুদ্ধের গতি ও কৌশলে পরিবর্তন এলেও সংঘাতের অবসানের কোনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত এখনো দেখা যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চীন, ভারত ও ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করে রাশিয়া বিকল্প বাণিজ্যিক পথ তৈরি করেছে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডারের মালিক হওয়ায় মস্কো মনে করে, সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি নিতে পশ্চিমা শক্তিগুলোও সতর্ক থাকবে। সেই বাস্তবতায় যুদ্ধ কূটনৈতিকভাবে যতটা জটিল হচ্ছে, সামরিক ক্ষেত্রেও ততটাই দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য