খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জুলাই ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম

মেক্সিকোর বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে নামার আগেই মাঠের বাইরের এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু হয়ে গেছে ইংল্যান্ড ফুটবল দলের জন্য। ম্যাচের আগের রাতে ইকুয়েডর দলের ফুটবলারদের যেভাবে হোটেল ভাঙচুর না করলেও ঘুমাতে দেয়নি মেক্সিকান সমর্থকেরা, ঠিক একই তেতো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ইংলিশদেরও। টিম হোটেলের পাশে মাঝরাতে উচ্চশব্দে গাড়ির হর্ন বাজানো, সাইরেন কিংবা তীব্র আওয়াজে গান গেয়ে হইচই করা—মেক্সিকোর ফুটবল উন্মাদনার এটি এক চিরচেনা ও চতুর রূপ। ইংলিশ টিম ম্যানেজমেন্ট মেক্সিকোতে এসে ফুটবলারদের মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে নিজেদের হোটেলের ঠিকানা গোপন রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিল, কিন্তু মেক্সিকান ফুটবল আল্ট্রাসদের হাত থেকে শেষ রক্ষা হয়নি।
বিমানবন্দরে পা রাখার পর থেকেই মেক্সিকোর জার্সি ও পতাকা হাতে স্থানীয় সমর্থকেরা হ্যারি কেনদের লক্ষ্য করে দুয়ো দেওয়া শুরু করেন। দ্রুতই তারা খুঁজে বের করে ফেলেন ইংল্যান্ড দলের হোটেলের ঠিকানা। ফলে মাঠের লড়াই শুরুর আগেই প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করার মেক্সিকান কৌশল ভালোভাবেই টের পাচ্ছে টমাস টুখেলের শিষ্যরা। তবে মাঠের বাইরের এই গোলযোগ তো কেবল শুরু, আসল পরীক্ষা অপেক্ষা করছে আসতেকা স্টেডিয়ামের ভেতরে। বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল ৬টার এই ম্যাচে গ্যালারির গগনবিদারী চিৎকার ও ৯০ হাজার মারমুখী দর্শকের চাপ সামলানোর পাশাপাশি থ্রি লায়ন্সদের লড়তে হবে প্রকৃতির বিরুদ্ধেও।
আসতেকা স্টেডিয়ামে সফরকারী দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ এখানকার ভৌগোলিক পরিবেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২ হাজার মিটারেরও বেশি উঁচুতে অবস্থিত এই স্টেডিয়ামে বাতাসের ঘনত্ব সমতলের চেয়ে অনেক কম। ফলে ইউরোপের কন্ডিশনে খেলে অভ্যস্ত ইংলিশ ফুটবলারদের জন্য এখানে এসে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়াটাই এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যোগ হবে মেক্সিকোর তীব্র গরম ও আর্দ্রতা। পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে এই কন্ডিশনে ভিনদেশি ফুটবলাররা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন, যা মাঠের পারফরম্যান্সে ও ট্যাকটিক্যাল প্রয়োগে বড় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ইতিহাসের পাতাও কথা বলছে স্বাগতিকদের পক্ষে। নিজেদের ঘরের মাঠে মেক্সিকো কতটা ভয়ংকর, তা প্রমাণিত হয় আসতেকা স্টেডিয়ামের অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানে। এই মাঠে খেলা ৮৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যে মেক্সিকানরা হেরেছে মাত্র দুটি ম্যাচে। রেকর্ড তিনবারের বিশ্বকাপ আয়োজক দেশ মেক্সিকো ঘরের মাঠে বিশ্বকাপের ১০টি ম্যাচ খেলে আজ পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছে। এই অজেয় দুর্গ ভাঙা যেকোনো পরাশক্তির জন্যই প্রায় অসম্ভব এক মিশন। নিচে আসতেকা স্টেডিয়ামে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আধিপত্য এবং স্টেডিয়ামের প্রধান ১০টি উল্লেখযোগ্য তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | তথ্যের বিবরণ | পরিসংখ্যান / বিবরণ |
| ১ | সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা | ২,১৯৫ মিটার (৭,২০০ ফুট) |
| ২ | মোট আন্তর্জাতিক ম্যাচ (মেক্সিকো) | ৮৯টি |
| ৩ | মেক্সিকোর মোট পরাজয় | মাত্র ২টিতে |
| ৪ | বিশ্বকাপে স্বাগতিক হিসেবে ম্যাচ | ১০টি |
| ৫ | বিশ্বকাপে মেক্সিকোর হার | ০ (অপরাজিত) |
| ৬ | মোট বিশ্বকাপ ফাইনাল আয়োজন | ২টি (১৯৭০ এবং ১৯৮৬) |
| ৭ | স্টেডিয়ামের বর্তমান দর্শক ধারণক্ষমতা | ৮৭,৫২৩ জন |
| ৮ | সর্বোচ্চ দর্শক উপস্থিতির রেকর্ড | ১,১৯,৮৫৩ জন (১৯৬৮ সালে) |
| ৯ | ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী | ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ (১৯৮৬) |
| ১০ | প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ উদ্বোধন | ২৯ মে, ১৯৬৬ সাল |
ইংল্যান্ডের জন্য এই মাঠের স্মৃতি আরও বেশি বেদনাদায়ক। দীর্ঘ ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে এই আসতেকা স্টেডিয়ামেই আর্জেন্টিনার কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছিল ইংলিশরা। ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং পাঁচ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করা শতাব্দীর সেরা গোলের সাক্ষী এই মাঠ। চার দশক পর সেই পুরনো ক্ষত আর ঐতিহাসিক ভূত তাড়িয়ে বেড়ানো মাঠে নতুন এক অধ্যায় লিখতে চান হ্যারি কেন, বুকায়ো সাকারা।
সব মিলিয়ে কন্ডিশন, দর্শক এবং ইতিহাস যে স্বাগতিকদের দিকেই হেলে আছে, তা অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন ইংল্যান্ডের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার মার্ক গেহি। ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি মেক্সিকোকেই স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে রেখে বলেন, “আমরা খুব ভালো করেই জানি মেক্সিকো কতটা শক্তিশালী দল। গ্যালারির পুরো সমর্থন তারা পাবে, যা তাদের দ্বিগুণ শক্তি জোগাবে। নিজেদের চেনা কন্ডিশনে তারা খেলবে এবং ইদানীং ডিফেন্সেও তারা দুর্দান্ত, গোল খুব কম হজম করছে। সব মিলিয়ে আমি তাদেরই ফেবারিট বলবো। তবে বিশ্বকাপে টিকে থাকতে হলে আপনাকে যেকোনো কন্ডিশনে বিশ্বের শীর্ষ দলগুলোর মুখোমুখি হওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। আমাদের পুরো দল এই কঠিন চ্যালেঞ্জটি নিতে মুখিয়ে আছে।” কোয়ার্টার ফাইনালের এই অগ্নিপরীক্ষায় টুখেলের আধুনিক কৌশল আর ফুটবলারদের শারীরিক দম কতটা কাজে দেয়, এখন ফুটবলবিশ্ব সেটাই দেখার অপেক্ষায় রয়েছে।
মন্তব্য