খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১ই জুলাই ২০২৬, ৫:২ পিএম

১১ কোটি টাকারও বেশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া আরও এক ধাপ এগিয়েছে। আজ বুধবার (১ জুলাই) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫ এর বিচারক আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালতে নতুন করে আরও ছয়জন সাক্ষী তাঁদের জবানবন্দি দিয়েছেন। এর মাধ্যমে মামলাটিতে এখন পর্যন্ত মোট ১৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হলো।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় মোট সাক্ষীর সংখ্যা ২৮ জন। এর আগে গত ২৩ জুন আরও আটজন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। আজ ছয়জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত আগামী ১৬ জুলাই পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য নতুন দিন ধার্য করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম জানান, সাবেক আইজিপির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠনের পর থেকে বিচারিক প্রক্রিয়া বেশ দ্রুত গতিতেই চলছে এবং ইতিমধ্যেই অর্ধেক সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া শেষ হয়েছে।
আজ আদালতে যে ছয়জন সরকারি কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁরা হলেন—নারায়ণগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার মো. আবদুল হাফিজ, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের সাব-রেজিস্ট্রার এস এম মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁর মহাদেবপুরের সাব-রেজিস্ট্রার মো. রফিকুল ইসলাম, ভোলার চরফ্যাশনের সাব-রেজিস্ট্রার কাওসার খান, বন অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুস সালাম এবং ঢাকার বাড্ডার সাব-রেজিস্ট্রার জাহাঙ্গীর আলম। মূলত বেনজীর আহমেদের নামে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কেনা জমি ও স্থাবর সম্পত্তির দলিল দস্তাবেজ যাচাইয়ের অংশ হিসেবেই এই সাব-রেজিস্ট্রারদের সাক্ষ্য নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বরে দুদকের উপপরিচালক হাফিজুল ইসলাম বাদী হয়ে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে এই মামলাটি দায়ের করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা সব নথিপত্র যাচাই-বাছাই করে ২০Target২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দেন। এরপর গত ৩ মে আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর আদেশ দেন।
দুদকের অভিযোগপত্রে বেনজীর আহমেদের বিপুল সম্পত্তির একটি হিসাব তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সাবেক এই পুলিশ প্রধান তাঁর জমা দেওয়া সম্পদ বিবরণীতে ৬ কোটি ৪৫ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পত্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে দুদকের গভীর তদন্তে দেখা যায়, বাস্তবে তাঁর নামে ৭ কোটি ৫২ লাখ ৬৮ Logic৯৮৭ টাকার স্থাবর এবং ৮ কোটি ১৫ লাখ ৩১ লাখ ২৬৪ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এর বিপরীতে তাঁর বৈধ আয়ের উৎস পাওয়া গেছে মাত্র ৬ কোটি ৫৯ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৮ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় বাদ দেওয়ার পর তাঁর নিট সঞ্চয় থাকার কথা ৪ কোটি Constants৬৩ লাখ ৫৬ হাজার ৬৭৫ টাকা। ফলে সব মিলিয়ে ১১ কোটি ৪ লাখ ৪৩ হাজার ৫৭৬ টাকার সম্পদ তাঁর জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা অবৈধ বলে প্রমাণিত হয়েছে।
অবৈধ সম্পদ অর্জনের এই মূল মামলাটি ছাড়াও বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আরও পাঁচটি মামলা করেছে দুদক। এর মধ্যে দুই মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। বাকি তিনটি মামলায় তাঁর স্ত্রী জীশান মির্জা, দুই মেয়ে ফারহিন রিশতা বিনতে বেনজীর ও তাহসিন রাইসা বিনতে বেনজীরকে মূল আসামি করে বেনজীরকে সহযোগী আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে এই মামলাগুলো তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যান্য মামলার মধ্যে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর সরকারি পদে থেকেও তথ্য গোপন করে নিজেকে বেসরকারি চাকরিজীবী দেখিয়ে পাসপোর্ট তৈরির অভিযোগে একটি মামলা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অর্থ পাচারের অভিযোগে বেনজীর ও তাঁর পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করে দুদক। এছাড়া ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়ের নামে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাবের মহাপরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁর মেয়াদের এই বিপুল সম্পদের উৎস নিয়েই এখন বিচার চলছে আদালতে।
প্রয়োজনীয় উপাত্ত ও মামলার পরিসংখ্যানগুলো নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিবরণ ও সূচক | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| মামলার মোট সাক্ষী | ২৮ জন |
| এখন পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া সাক্ষ্যগ্রহণ | ১৪ জন |
| পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের নির্ধারিত তারিখ | ১৬ জুলাই, ২০২৬ |
| মামলা দায়েরের তারিখ | ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৪ |
| আদালতে অভিযোগপত্র জমার তারিখ | ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ |
| আদালতে অভিযোগ গঠনের তারিখ | ৩ মে, ২০২৬ |
| বেনজীর ঘোষিত স্থাবর সম্পদ | ৬,৪৫,৩৭,৩৬৫ টাকা |
| বেনজীর ঘোষিত অস্থাবর সম্পদ | ৫,৭৪,৮৯,৯৬৬ টাকা |
| দুদকের তদন্তে প্রাপ্ত মোট স্থাবর সম্পদ | ৭,৫২,৬৮,৯৮৭ টাকা |
| দুদকের তদন্তে প্রাপ্ত মোট অস্থাবর সম্পদ | ৮,১৫,৩১,২৬৪ টাকা |
| মোট অবৈধ বা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ | ১১,০৪,৪৩,৫৭৬ টাকা |
| বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে মোট মামলার সংখ্যা | ৬টি (মূল মামলাসহ) |
| আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়কাল | ১৫ এপ্রিল, ২০২০ – ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ |
মন্তব্য