খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১১:২৬ পিএম

ভালো বেতনে লোভনীয় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চার তরুণকে টেকনাফে এনে অপহরণের এক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। গহীন পাহাড়ের আস্তানায় তিন দিন আটকে রেখে এসব তরুণের পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করছিল এক অপহরণকারী চক্র। আজ মঙ্গলবার দুপুরে র্যাব ও পুলিশের একটি যৌথ দল টানা আড়াই ঘণ্টার এক শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান চালিয়ে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী জুম্মাপাড়া পাহাড় থেকে এই চার তরুণকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অপহরণকারীরা গভীর জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
উদ্ধার হওয়া তরুণেরা হলেন—ফেনী জেলার গণিপুর গ্রামের এমাম হোসেন (১৯) ও জিসান (২৩), একই জেলার রামপুর এলাকার তৌহিদুল ইসলাম (১৯) এবং হবিগঞ্জ জেলার সুমন মিয়া ওরফে হোসাইন (২২)।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, অপহরণের মূল হোতা টেকনাফের রঙ্গীখালী গ্রামের বাসিন্দা রাসেল। তিনি কিছুদিন ফেনীতে কাজ করার সুবাদে স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং বড় অংকের বেতনের চাকরির লোভ দেখান। তার ফাঁদে পা দিয়েই গত ২৭ জুন ফেনী ও হবিগঞ্জ থেকে এই চার তরুণ টেকনাফে আসেন। কিন্তু টেকনাফে পৌঁছামাত্রই তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রঙ্গীখালীর দুর্গম পাহাড়ি আস্তানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
সেখানে আটকে রেখে তরুণদের ওপর চালানো হতো অমানবিক নির্যাতন। অপহরণের পরদিনই যুবকদের মোবাইল থেকে তাদের নিজ নিজ পরিবারে ফোন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে দুর্বৃত্তরা। মুক্তিপণের টাকা না দিলে সবাইকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে একটি পরিবার তাদের সন্তানের জীবন বাঁচাতে অপহরণকারীদের দেওয়া বিকাশ নম্বরে ইতিমধ্যে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়েছিল।
উদ্ধার হওয়া হোসাইনের মা দিল বাহার নিজের ফেসবুক ও স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্য চেয়ে জানান, তার ছেলে কখন বাড়ি থেকে চাকরির উদ্দেশ্যে টেকনাফ গেছে তা তিনি জানতেন না। গত শনিবার হঠাৎ অপরিচিত এক ব্যক্তি ফোন করে জানায় যে তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর ওপাশ থেকে হোসাইনের কান্নাকাটি ও অমানবিক মারধরের চিৎকার শোনানো হয়। ছেলেকে বাঁচাতে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন।
টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মুক্তিপণ দাবির বিষয়টি জানার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগের ভিত্তিতে তারা তদন্ত শুরু করেন। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে অপহরণকারীদের মোবাইল লোকেশন ট্র্যাক করা হয়। একপর্যায়ে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, অপহৃত তরুণদের হ্নীলা ইউনিয়নের রঙ্গীখালী জুম্মাপাড়া পাহাড়ের একটি গোপন আস্তানায় বন্দি করে রাখা হয়েছে।
এরপর আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত র্যাব ও পুলিশের আভিধানিক দল ওই দুর্গম পাহাড়ে একযোগে যৌথ অভিযান চালায়। পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত অপহরণকারীদের আস্তানাটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে পুলিশ। তবে গহীন বনের ভৌগোলিক সুবিধা নিয়ে মূল অপরাধী রাসেল ও তার সহযোগীরা জঙ্গলের আরও গভীরে আত্মগোপন করে। পরে বিকেলের দিকে উদ্ধার হওয়া চার তরুণকে অক্ষত অবস্থায় টেকনাফ মডেল থানায় নিয়ে আসা হয়।
ওসি আরও জানান, উদ্ধারকৃত তরুণদের তাদের নিজ নিজ পরিবারের কাছে নিরাপদে হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়া চলছে। এই অপহরণ চক্রের মূল হোতা রাসেলসহ ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকি অপরাধীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের জন্য পাহাড়ি এলাকায় চিরুনি অভিযান চালানো হচ্ছে। এই ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত অপহরণ মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছে।
মন্তব্য