খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১০:২৭ পিএম

ঢাকার কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর এলাকায় অবস্থিত ‘স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিস’ কার্যালয়ে এক গাড়িচালককে আটকে রেখে হাত-পায়ের নখ উপড়ে ফেলা ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল সোমবার রাতে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। ক্ষুব্ধ চালক ও পরিবহন শ্রমিকেরা ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেন এবং ঘাটারচর সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে যাওয়া পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এই সংঘর্ষে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ওসিসহ বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য, আন্দোলনকারী শ্রমিক এবং সাধারণ পথচারী মিলিয়ে অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং নতুন করে বিশৃঙ্খলা এড়াতে বিপুলসংখ্যক অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
নির্যাতনের শিকার ওই চালকের নাম শাহ আলম (২৮)। ঘটনার বিবরণ দিয়ে ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা জানান, সোমবার সন্ধ্যায় শাহ আলম একটি পণ্যবাহী গাড়ি নিয়ে ঘাটারচর কার্যালয় থেকে বের হন। পথিমধ্যে সড়কের পাশে গাড়িটি রেখে তিনি সামান্য নাস্তা করতে যান। কিন্তু ফিরে এসে দেখেন তার গাড়িটি যথাস্থানে নেই। এরপর তিনি তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে ফিরে যান এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। প্রতিটি গাড়িতে জিপিএস ট্র্যাকিং ব্যবস্থা থাকায় শাহ আলম কর্মকর্তাদের অনুরোধ করেন জিপিএসের মাধ্যমে গাড়িটির অবস্থান শনাক্ত করতে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও কয়েকজন কর্মচারী তার কথায় কর্ণপাত না করে উল্টো তাকেই গাড়ি চুরির অপবাদ দেন। একপর্যায়ে রাসেল, মামুন, লিন্টন, কাজল, নুর উদ্দিন ও শুভ নামের কয়েকজন কর্মচারী শাহ আলমকে একটি কক্ষে আটকে রেখে লাঠি ও রড দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করেন। শ্রমিকদের দাবি, নির্যাতনের চরম পর্যায়ে শাহ আলমের পায়ের নখ উপড়ে ফেলা হয়। এমনকি তিনি যখন যন্ত্রণায় কাতর হয়ে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি চাচ্ছিলেন, তখন তাকে জোরপূর্বক ব্যাটারির অ্যাসিড পান করানোর চেষ্টাও করা হয়। পরে গুরুতর আহত ও রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নির্যাতনের এই খবরটি কুরিয়ার সার্ভিসের অন্য চালক ও স্থানীয় পরিবহন শ্রমিকদের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শতাধিক বিক্ষুব্ধ চালক ঘাটারচর সড়ক অবরোধ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে তারা স্টেডফাস্ট কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ে চড়াও হয়ে প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকেন এবং ভেতরের আসবাবপত্র ও কম্পিউটার ভাঙচুর করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কার্যালয়ের সামনে পার্কিংয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানের প্রায় অর্ধশতাধিক কাভার্ড ভ্যান ও গাড়ির কাচ হাতুড়ি ও লাঠিসোটা দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আজ মঙ্গলবার সকালেও চালকেরা সেখানে অবস্থান নিয়ে দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ অব্যাহত রাখেন।
শ্রমিক প্রতিনিধি আনোয়ার ও চালক রুবেল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শাহ আলমের ওপর এই বর্বর হামলার সুষ্ঠু বিচার এবং মূল আসামিদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই কাজে ফিরবেন না এবং তাদের এই আন্দোলন ও কর্মবিরতি অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, আন্দোলনরত শ্রমিকদের অভিযোগ, পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে প্রকৃত অপরাধী কর্মকর্তাদের পক্ষ নিয়েছে এবং শ্রমিকদের ওপর অন্যায়ভাবে লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেট ছুড়েছে।
শ্রমিকদের অভিযোগ অস্বীকার করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু উত্তেজিত শ্রমিকেরা পুলিশের ওপর চড়াও হয় এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে।” ইটের আঘাতে ওসিসহ উপ-পরিদর্শক (এসআই) সোহাগ এবং কনস্টেবল জয়নাল গুরুতর আহত হন।
এই বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আরাফাতুল ইসলাম জানান, “বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং শান্ত আছে। আমরা মালিক ও শ্রমিক—উভয়পক্ষের সঙ্গেই কথা বলছি। একজন চালকের ওপর নির্যাতনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং এই অমানবিক নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে আমাদের তদন্ত দল কাজ করছে।”
মন্তব্য