খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১১:৪৪ পিএম

পাত্র সেজে মেয়ে দেখতে এসেছে এক দল মানুষ। গ্রামীণ চাদরে মোড়ানো ছিমছাম এক বাড়িতে চলছে অতিথি আপ্যায়ন, চা-নাস্তার পর্ব আর কুশল বিনিময়। কিন্তু এই পাত্রপক্ষের মূল ব্যক্তিটি কোনো সাধারণ পাত্র নন, তিনি আসলে ছদ্মবেশে থাকা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) একজন চৌকস কর্মকর্তা। তাঁর উদ্দেশ্য বিয়ে নয়, বরং একটি নৃশংস খুনের মামলার মূল আসামিদের গোপন আস্তানা খুঁজে বের করা।
কিছুক্ষণ কৌশলী কথাবার্তা বলার পরই বেরিয়ে আসে পরম কাঙ্ক্ষিত সেই তথ্য। পিবিআই যাকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল, সেই দুই ভাই ওই বাড়িতে না থাকলেও পাশের এক আত্মীয়ের বাড়িতেই আত্মগোপন করে আছেন। তথ্যটি নিশ্চিত হওয়া মাত্রই সেখানে ঝটিকা অভিযান চালায় পিবিআই। হাতেনাতে গ্রেপ্তার হন দুই সহোদর রমজান আলী ওরফে লিমন ও হাসিবুর রহমান ওরফে শান্ত। তাঁদের গ্রেপ্তারের পর নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে উন্মোচিত হয় নরসিংদীর চাঞ্চল্যকর কিশোরী সুমনা আক্তার তিথি হত্যাকাণ্ডের পুরো নৃশংস পরিকল্পনা, যার নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল প্রবাসীর পাঠানো টাকার তীব্র লোভ।
মামলার তদন্ত নথি ও পিবিআই কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০event সালের ২৭ জানুয়ারি রাতে নরসিংদী সদর উপজেলার শেখেরচর গ্রামে এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে। নিজ বাড়িতে রাতের আঁধারে ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী সুমনা আক্তার তিথিকে হাতুড়ি দিয়ে মাথায় নির্মমভাবে আঘাত করে হত্যা করা হয়। খুনিদের হাত থেকে রেহাই পাননি তিথির মা আসমা আক্তারও। তাকেও হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা লুট করে পালায় দুর্বৃত্তরা।
হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সামনে কোনো দৃশ্যমান সূত্র বা ক্লু ছিল না। গ্রামীণ ওই বাড়ির আশেপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না, এমনকি ঘটনার কোনো প্রত্যক্ষদর্শীও মেলেনি। ফলে তদন্তের শুরুতে পিবিআই একপ্রকার অন্ধকারেই পথ খুঁজছিল। এ অবস্থায় তদন্তকারী দল নিহত তিথির বাবা মোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বলেন এবং পরিবারের অভ্যন্তরীণ আর্থিক লেনদেনের সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখতে শুরু করেন।
কথোপকথনের একপর্যায়ে মোফাজ্জল হোসেন জানান, তাঁর বড় মেয়ে এবং কম্বোডিয়াপ্রবাসী জামাতা নিয়মিত তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা পাঠাতেন। আর নরসিংদীতে সেই ব্যাংক বা এজেন্টের টাকা তোলার কাজে প্রায়ই তাঁদের পরিচিত তরুণ হাসিবুর রহমান শান্ত সহযোগিতা করতেন। এই একটিমাত্র তথ্যই পুরো তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
পিবিআই তাৎক্ষণিকভাবে হাসিবুরের মুঠোফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (CDR) এবং টাওয়ার লোকেশন বিশ্লেষণ শুরু করে। প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, হত্যাকাণ্ডের রাতে হাসিবুর ঘটনাস্থল অর্থাৎ নরসিংদীতেই অবস্থান করছিলেন এবং পরদিন খুব ভোরেই দ্রুত ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় চলে যান। এই অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক গতিবিধি পিবিআইয়ের সন্দেহকে আরও জোরালো করে তোলে। এর মধ্যেই আরেকটি গোপন সূত্রে জানা যায়, হাসিবুরের ভাই রমজান আলী বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা সঙ্গে নিয়ে কিশোরগঞ্জের দিকে রওনা হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর ও নরসিংদীতে টানা কয়েক দিন নিখুঁত নজরদারি ও স্বজনদের সূত্র ধরে পিবিআই নিশ্চিত হয় যে, দুই ভাই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এরপর আসামিরা ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে অবস্থান নিলে সেখানে পিবিআইয়ের দল পাত্র সেজে নিখুঁত ছদ্মবেশে অভিযান চালায়। ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাতে ফরিদপুর থেকে রমজান ও হাসিবুরকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তাঁদের কাছ থেকে লুট হওয়া ১০ লাখ ১ হাজার ১০০ টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১ ফেব্রুয়ারি নরসিংদী থেকে এই চক্রের বাকি দুই সদস্য কাউছার মিয়া ও ইমন আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া চারজনই আদালতে নিজেদের অপরাধ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দি অনুযায়ী, মোফাজ্জল হোসেনের বাড়িতে প্রবাসী জামাতার পাঠানো বিপুল টাকা গচ্ছিত থাকার খবর বড় ভাই হাসিবুরের কাছ থেকে জানতে পারেন রমজান। টাকার লোভে পড়ে রমজান তাঁর বন্ধু কাউছার ও ইমনকে নিয়ে ডাকাতির ছক কষেন। পরিকল্পনা সফল করতে স্থানীয় বাজার থেকে একটি হাতুড়ি ও রশিও কেনেন তাঁরা। কিন্তু চুরির সময় চিনে ফেলায় নিষ্পাপ তিথিকে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে তারা।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই নরসিংদীর পরিদর্শক শহিদুল ইসলাম জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতে ইতিমধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেওয়া হয়েছে। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনা করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে এবং বর্তমানে আদালতে এই স্পর্শকাতর মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া ও নিয়মিত শুনানি চলছে।
মন্তব্য