খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ১০:৫০ পিএম

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সাথে তাকে ২ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও সাজা ভোগের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। বেঞ্চের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে আসামির বিরুদ্ধে আনা ৮টি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে ৩টিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং বাকি ৫টি অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেওয়া হয়েছে। সাজাপ্রাপ্ত ৩টি অপরাধের প্রতিটির জন্য ১০ বছর করে মোট ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সব সাজা একসঙ্গে (যুগপৎ) চলবে। ফলে জাসদ সভাপতিকে কার্যত ১০ বছর জেল খাটতে হবে। তবে এই রায়ে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ—কোনো দলই সন্তোষ প্রকাশ করতে পারেনি। রাষ্ট্রপক্ষ সাজা কম হওয়ায় এবং ৫টি অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে আসামিপক্ষ একে ‘ফরমায়েশি রায়’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
Table of Contents
রায় ঘোষণার আগে কড়া নিরাপত্তায় হাসানুল হক ইনুকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) এই রায় সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল। দীর্ঘ রায় পড়ার শেষ দিকে যখন সাজা ঘোষণা করা হচ্ছিল, তখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ইনু মৃদু হেসে ওঠেন। রায় ঘোষণা শেষে এজলাস থেকে নামিয়ে হাজতখানায় নিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকদের দেখে সাবেক এই মন্ত্রী চড়া গলায় বলেন, “১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান সাজা দিয়েছিল, আজ তাঁর ছেলে সাজা দিল। এটি প্রহসনের আদালতে তারেক জিয়ার ফরমায়েশি রায়। যাক, বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি হলো।”
আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত ইনুর স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য আফরোজা হক রীনা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা মনে করি এটি আইনের নিকৃষ্টতম অপব্যবহার এবং চরম অবিচার। আমরা এই রায় প্রত্যাখ্যান করছি। ১৯৭১ সাল থেকে আমরা যে অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে যুদ্ধ করেছি, এই রায়ের মাধ্যমে তার উল্টো মতবাদের প্রতিফলন ঘটল।”
ট্রাইব্যুনালের রায়ে ইনুর বিরুদ্ধে আনা ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
৩ নম্বর অভিযোগ: ২০২৪ সালের ২০ জুলাই কুষ্টিয়ার তত্কালীন পুলিশ সুপারকে (এসপি) ফোন করে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করার নির্দেশ দেন ইনু। একই সাথে আন্দোলন কঠোরভাবে দমন, আটক ও নির্যাতনের উসকানি দেন। এই অভিযোগে ভুক্তভোগী রাইসুল হকসহ অন্যদের নির্যাতনের দায়ে তাকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৬ নম্বর অভিযোগ: গত বছর ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক’ তকমা দিয়ে এবং জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি মূলত সাধারণ মানুষের ওপর চলা হত্যাযজ্ঞের রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর দায়ে তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও ১০ বছরের সাজা দেওয়া হয়।
৭ নম্বর অভিযোগ: ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে সারাদেশে কারফিউ জারির মাধ্যমে নির্বিচারে গুলি বর্ষণের কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখেন এবং তা বাস্তবায়নে অধস্তনদের নির্দেশনা দেন। এই অপরাধেও তাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা ও ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
রায়ের পর তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, “আমরা এই রায়ে মোটেও সন্তুষ্ট নই। হাসানুল হক ইনুর অপরাধের যে গভীরতা, তাতে তাঁর সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত ছিল। যে তিনটি অভিযোগে তাকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সাজার মেয়াদ বাড়াতে এবং যেসব অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে আমরা উচ্চ আদালতে আপিল করব।” রায় ঘোষণার সময় আদালতে প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম, গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম, বি এম সুলতান মাহমুদসহ তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর গত বছর ২৫ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্ত শুরু হয়। সাড়ে পাঁচ মাস তদন্ত শেষে ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন দাখিল করে। গত বছর ২ নভেম্বর ইনুর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষের মোট ১০ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন এবং আসামিপক্ষে ২ জন সাফাই সাক্ষী দেন। গত ১৪ মে উভয় পক্ষের চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষ হলে ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণার জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এরপর ২২ জুন আদালত ৩০ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ট্রাইব্যুনালে এটি পঞ্চম মামলার রায়। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ ১৬ জনকে পৃথক মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
মন্তব্য