সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ ধর্মীয় রীতিতে স্পিকারের চেয়ারে সম্মান প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির আলোকে সংসদ সদস্যদের স্পিকারের চেয়ার বা সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের বৈঠকের সূচনা লগ্নে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এই সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে হাউসকে অবহিত করেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা এখন থেকে যার যার নিজস্ব ধর্মীয় রীতি অনুসরণ করে স্পিকারের চেয়ার বা সভাপতির প্রতি প্রয়োজনীয় সম্মান প্রদর্শন করতে পারবেন।

প্রেক্ষাপট ও সংসদীয় রীতির ইতিহাস

সাধারণত সংসদীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, সংসদ কক্ষে প্রবেশ করার সময়, কক্ষ ত্যাগ করার সময় কিংবা আসন গ্রহণ ও বর্জনের সময় হাউস এবং সভাপতিকে সম্মান জানানোর একটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত রীতি রয়েছে। এই রীতি পালনে অনেক সংসদ সদস্য মাথা ঝোঁকানোর (বো করার) পদ্ধতি অবলম্বন করতেন, আবার অনেকে দাঁড়িয়ে মৌখিকভাবে সালাম বা অভিবাদন জানাতেন।

স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আজ সিদ্ধান্ত জানাতে গিয়ে এই রীতির ঐতিহাসিক আইনি প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অতীতে জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে স্পিকারের প্রতি ‘ঝুঁকে’ সম্মান প্রদর্শনের একটি স্পষ্ট বিধান বলবৎ ছিল। তবে ২০০৬ সালে কার্যপ্রণালি বিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনীর মাধ্যমে এই ‘ঝুঁকে’ সম্মান প্রদর্শন বা মাথা ঝোঁকানোর বাধ্যবাধকতার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বাদ দেওয়া হয়। ২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর অষ্টম জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন জমা দেয়, যা পরবর্তীতে ২৬ সেপ্টেম্বর সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল।

বিতর্কের সূত্রপাত ও সিদ্ধান্তের কারণ

স্পিকারের এই সিদ্ধান্তের পেছনে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সংসদের ভেতরে তৈরি হওয়া একটি বিতর্ক এবং পয়েন্ট অব অর্ডারে সংসদ সদস্যদের উত্থাপিত আপত্তির প্রেক্ষাপট রয়েছে। গত ১৬ জুন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান সংসদ কক্ষে মাথা ঝুঁকিয়ে বা কুর্নিশ করে সম্মান প্রদর্শনের বর্তমান চর্চার বিষয়ে তীব্র আপত্তি উত্থাপন করেন। তিনি পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি পূর্বে কার্যপ্রণালি বিধিতে বহাল থাকলেও আইনি সংশোধনীর মাধ্যমে তা অনেক আগেই বাতিল করা হয়েছে। মুজিবুর রহমানের এই আপত্তির জবাবে তৎকালীন সময়ে স্পিকার জানিয়েছিলেন যে, বিষয়টি তিনি বিশদভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তীতে হাউসে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন।

এরই ধারাবাহিকতায়, গত গতকাল বুধবার বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুকও সংসদের অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপন করেন এবং এ বিষয়ে চলমান অস্পষ্টতা দূর করার লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সুরাহা বা নির্দেশনা দেওয়ার জন্য স্পিকারের প্রতি বিশেষভাবে অনুরোধ জানান।

কার্যপ্রণালি বিধির ধারা ও স্পিকারের চূড়ান্ত রুলিং

সংসদ সদস্যদের অনুরোধ ও আপত্তির বিষয়টি পরীক্ষা করে আজ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির সুনির্দিষ্ট ধারা ও উপধারা উল্লেখ করে রুলিং দেন। তিনি কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ (১) নম্বর বিধির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, উক্ত বিধিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে:

‘সংসদের বৈঠক চলাকালে কোনো সদস্য সংসদে প্রবেশ করার বা সংসদ–কক্ষ ত্যাগ করার সময় এবং তাঁহার আসন গ্রহণ বা ত্যাগ করার সময়ে সভাপতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিবেন।’

স্পিকার তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করেন যে, যেহেতু বিধিতে থাকা ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি ২০০৬ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাই মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান প্রদর্শন করার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা এখন আর নেই। অতঃপর তিনি সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে বলেন, “যেহেতু ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়েছে, মাননীয় সদস্যবৃন্দ, আপনারা যার যার ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী স্পিকারের চেয়ারের প্রতি বা সভাপতির প্রতি সম্মান জানাবেন।”

ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্য সারণি:

সংসদীয় বিষয়সংশ্লিষ্ট আইন, তারিখ ও বিবরণ
সিদ্ধান্ত প্রদানকারীস্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
ঘোষণার সময়আজ বৃহস্পতিবার, জাতীয় সংসদের বৈঠকের শুরুতে।
মূল সিদ্ধান্তসংসদ সদস্যরা নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী স্পিকারের চেয়ার/সভাপতির প্রতি সম্মান জানাবেন।
সংশ্লিষ্ট আইনি বিধিজাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৭ (১) নম্বর বিধি।
আইনি সংশোধনীর ইতিহাস২০০৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন; ২৬ সেপ্টেম্বর সংসদে গৃহীত এবং ‘ঝুঁকিয়া’ শব্দ বর্জন।
আপত্তি উত্থাপনকারী১৬ জুন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান (পয়েন্ট অব অর্ডারে)।
সুরাহার অনুরোধকারীগতকাল বুধবার বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবদিন ফারুক।

স্পিকারের এই নতুন নির্দেশনার ফলে সংসদের দীর্ঘদিনের প্রচলিত কার্যপ্রণালিতে একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতাসম্পন্ন রীতির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটল, যা কার্যপ্রণালি বিধির মূল সুরের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।