বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সৃষ্ট বিশাল আর্থিক ক্ষতির একটি বড় অংশই এখনো কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বীমা সুরক্ষার আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সুইস রি ইনস্টিটিউট’-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈশ্বিক পর্যায়ে বীমা সুরক্ষার বাইরে থাকা আর্থিক ক্ষতির ঘাটতি বা ‘ইন্সুরেন্স প্রোটেকশন গ্যাপ’ বর্তমানে ৪২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। বিশেষ করে সামগ্রিক এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মোট ক্ষয়ক্ষতির প্রায় ৮৮ শতাংশই বীমা সুরক্ষার বাইরে রয়ে গেছে। এই বিশাল পরিমাণ অরক্ষিত আর্থিক ক্ষতি বাংলাদেশসহ এশিয়ার জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুতর সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
Table of Contents
২০২৫ সালের বৈশ্বিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি ও বীমা কভারেজের পরিসংখ্যান
সুইস রি ইনস্টিটিউটের বার্ষিক পর্যালোচনা থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৯০টি মাঝারি ও বৃহৎ প্রকৃতির প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত হেনেছে। এসব দুর্যোগের ফলে বিশ্ব অর্থনীতিতে সামগ্রিকভাবে ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রত্যক্ষ ক্ষয়ক্ষতি নথিবদ্ধ করা হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের মোট ক্ষতির মধ্যে বীমা খাতের মাধ্যমে মাত্র ১০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আর্থিক ক্ষতিপূরণ কভার করা সম্ভব হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির অর্ধেকেরও বেশি অংশ—যা প্রায় ১১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার—সম্পূর্ণ বীমাহীন অবস্থায় থেকে গেছে। এই বিপুল পরিমাণ অরক্ষিত আর্থিক লোকসানের সম্পূর্ণ দায়ভার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ জনগণ, বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারগুলোর ওপর এসে পড়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
নিচে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক দুর্যোগজনিত আর্থিক ক্ষতির একটি তুলনামূলক বিবরণী সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ভৌগোলিক অঞ্চল ও দুর্যোগের বিবরণ | মোট অর্থনৈতিক ক্ষতি (মার্কিন ডলারে) | বীমা থেকে প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণ (মার্কিন ডলারে) | বীমা সুরক্ষা ঘাটতির হার (শতকরা) |
| বৈশ্বিক সামগ্রিক চিত্র (২০২৫) | ২২০ বিলিয়ন | ১০৭ বিলিয়ন | ৫১.৩৬ শতাংশ |
| এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল | অত্যন্ত ব্যাপক | অত্যন্ত নগণ্য | ৮৮.০০ শতাংশ |
| মিয়ানমার (২০২৫ সালের ভূমিকম্প) | ১১ বিলিয়ন | ২০০ মিলিয়ন | ৯৮.১৮ শতাংশ |
উন্নয়নশীল বিশ্বের সংকট ও মিয়ানমারের বাস্তব উদাহরণ
প্রতিবেদনের বিশদ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে বিশ্বের উন্নয়নশীল এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো। উপযুক্ত কাঠামোগত অভাবের কারণে এসব দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়জনিত মোট আর্থিক ক্ষতির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশই বীমার আওতার বাইরে থেকে যায়। ফলস্বরূপ, যেকোনো বড় ধরনের দুর্যোগের পর জরুরি উদ্ধার কাজ, ক্ষতিগ্রস্ত নাগরিকদের জরুরি পুনর্বাসন এবং ভেঙে পড়া জাতীয় অবকাঠামো নতুন করে পুনর্গঠন করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সিংহভাগই সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার ও সাধারণ জনগণকে নিজস্ব উৎস থেকে জোগাড় করতে হয়।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিস্থিতি এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে নাজুক। এই ভৌগোলিক অঞ্চলে দুর্যোগ বীমা সুরক্ষার ঘাটতি প্রায় ৮৮ শতাংশ। এর সহজ অর্থ হলো, প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি ১০০ ডলার সমমূল্যের সম্পদের ক্ষতির বিপরীতে বীমা ব্যবস্থা থেকে মাত্র ১২ ডলারের মতো ক্ষতিপূরণ পাওয়া সম্ভব হয়। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল হওয়ায় বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্রসমূহ এই চরম আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে অবস্থান করছে।
এই চরম বাস্তবতার একটি প্রত্যক্ষ উদাহরণ হলো ২০২৫ সালে মিয়ানমারে সংঘটিত হওয়া প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্প। ওই একটিমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশটিতে প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয় এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে। অথচ দেশটির ভঙ্গুর বীমা ব্যবস্থার কারণে বীমা খাত থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে অবমুক্ত করা হয়েছে মাত্র ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কিছু বেশি অর্থ। এর ফলে মিয়ানমারের জাতীয় পুনর্গঠন কাজের প্রায় পুরো ব্যয়ই দেশটির সরকার, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা এবং স্বয়ং ক্ষতিগ্রস্ত ও সর্বস্বান্ত জনগণের ওপর এসে পড়ে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
উত্তর আমেরিকার পরিস্থিতি ও ‘সেকেন্ডারি পেরিলস’ বা গৌণ আবহাওয়া ঝুঁকি
যদিও মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণের দিক থেকে উত্তর আমেরিকা মহাদেশ, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তীব্র বজ্রঝড়, ভয়াবহ দাবানল এবং অন্যান্য চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে বীমা সুরক্ষার হার এবং সচেতনতা এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি উন্নত হওয়া সত্ত্বেও, সামগ্রিক ক্ষতির পরিমাণ এত বিশাল যে তা বৈশ্বিক দুর্যোগ ঝুঁকির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে প্রথাগত বড় দুর্যোগের পাশাপাশি এখন আবহাওয়াজনিত অন্যান্য ছোট ও মাঝারি দুর্যোগের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে শুধু শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় বা প্রলয়ঙ্করী বন্যাই নয়, বরং তীব্র দাবানল, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, ক্ষতিকর তাপপ্রবাহ এবং তীব্র বজ্রঝড়ের মতো ঘটনাগুলো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন ও বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুইস রি ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে যে বীমাকৃত ক্ষতি হয়েছে, তার প্রায় ৯২ শতাংশেরই উৎস ছিল এই ধরনের আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ, যা পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সেকেন্ডারি পেরিলস’ বা গৌণ ঝুঁকি হিসেবে পরিচিত। আবহাওয়াজনিত ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে এটি এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড।
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে দুর্যোগের ক্ষতিকর প্রভাব
বীমা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সময়োপযোগী সতর্কবার্তা। বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল, নদীভাঙনপ্রবণ এলাকা, বিস্তীর্ণ কৃষি খাত এবং দেশের বিপুল সংখ্যক নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রতিনিয়ত ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে। প্রতি বছর বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, তীব্র নদীভাঙন এবং বজ্রপাতের মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকার সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্যোগভিত্তিক বিশেষায়িত বীমা ব্যবস্থার ব্যবহার এখনো অত্যন্ত সীমিত ও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়ে গেছে। ফলে এই সমস্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলের ক্ষতি, ঘরবাড়ি ও গবাদিপশু ধ্বংসের সম্পূর্ণ আর্থিক ক্ষতি দেশের প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং সাধারণ পরিবারগুলোকে নিজেদেরই বহন করতে হয়, যা তাদের চিরতরে দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ করে ফেলে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর দেশের সরকারের ওপরও এক বিশাল আর্থিক ও বাজেট সংক্রান্ত চাপ সৃষ্টি হয়। দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সেতু, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করতে হয়। এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত লাখ লাখ মানুষের জরুরি খাদ্য সহায়তা, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা, পুনর্বাসন এবং নগদ অর্থ সহায়তা প্রদানের কারণে সরকারের পরিকল্পিত ব্যয়ের পরিধি অনেক বেড়ে যায়। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, দেশের মূল চালিকাশক্তি কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারকে নিজস্ব তহবিল থেকে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হয়। অনেক সময় এই ধরনের জরুরি ও unexpected ব্যয় মেটানোর জন্য সরকারকে দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত বাজেট বা অর্থ অন্য খাতে সরিয়ে নিতে হয়। এর ফলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়ে পড়ে এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়।
প্যারামেট্রিক বীমা ও সরকারি-private অংশীদারত্বের অপরিহার্যতা
এই জটিল অর্থনৈতিক সংকট ও দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় বর্তমান বিশ্বে ‘প্যারামেট্রিক বীমা’ বা সূচক-ভিত্তিক বীমা ব্যবস্থার ব্যবহার বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। প্রথাগত বীমা ব্যবস্থায় দুর্যোগের পর আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ক্ষতির পরিমাণ সরেজমিনে যাচাই করতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, যার কারণে ক্ষতিগ্রস্তরা সময়মতো অর্থ পায় না। কিন্তু প্যারামেট্রিক বীমা পদ্ধতিতে কোনো দীর্ঘ যাচাই প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয় না; বরং আগে থেকে নির্ধারিত কোনো প্রাকৃতিক সূচক বা ঘটনা ঘটলেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়। যেমন, যদি কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, ঘূর্ণিঝড়ের বাতাসের গতিবেগ কিংবা বন্যার পানির উচ্চতা আগে থেকে নির্ধারিত সীমা বা লেভেল অতিক্রম করে, তবে বীমা কোম্পানি সাথে সাথে চুক্তি অনুযায়ী অর্থ পরিশোধ করতে বাধ্য থাকে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্যোগের পরপরই দ্রুততম সময়ের মধ্যে আর্থিক সহায়তা পায়, যা তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে কৃষি বীমা, বন্যা বীমা এবং ঘূর্ণিঝড়ভিত্তিক প্যারামেট্রিক বীমা চালুর ব্যাপক সম্ভাবনা ও কার্যকারিতা রয়েছে। তবে এই আধুনিক বীমা ব্যবস্থা দেশব্যাপী সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে হলে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তরের আধুনিকায়ন, উন্নত ও নির্ভুল আবহাওয়া তথ্য সংগ্রহ, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সঠিক ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং সরকারের পক্ষ থেকে কার্যকর ও দূরদর্শী নীতিগত সহায়তা প্রদান করা আবশ্যক।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের এই বিশাল ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জ একা কোনো সাধারণ বীমা কোম্পানির পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। এই জন্য দেশের সরকার, দেশীয় বীমা খাত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বিশ্বের বড় বড় পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সুসংহত ও শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ গড়ে তুলতে হবে। এই যৌথ অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক মানুষের উপযোগী কম খরচে দুর্যোগ বীমা চালু করা, ঝুঁকির আর্থিক দায়ভার আন্তর্জাতিক বাজারে ভাগাভাগি করা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী জাতীয় পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে আরও টেকসই ও শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
সুইস রি ইনস্টিটিউটের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমানের এই বীমাহীন অসচেতনতার প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বীমাকৃত ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে ১৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে একই সাথে বীমার আওতার বাইরে থাকা অরক্ষিত ক্ষতির পরিমাণও জ্যামিতিক হারে বাাড়বে, যদি এখনই বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাস, জলবায়ু পরিবর্তন সহনশীল টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ এবং বীমা সুরক্ষার পরিধি সম্প্রসারণে কার্যকর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়।
পরিশেষে বলা যায়, প্রাকৃতিক দুর্যোগের তীব্রতা ও ফ্রিকোয়েন্সি বিশ্বজুড়ে দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই, বিশেষ করে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে বীমা সুরক্ষার হার সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট futures ভয়াবহ আর্থিক ক্ষতির সবচেয়ে বড় ও মারাত্মক চাপটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপরই আছড়ে পড়বে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ুগতভাবে চরম ঝুঁকিতে থাকা দেশের জন্য তাই এখনই সময়োপযোগী পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়। এখনই যদি জাতীয় পর্যায়ে দুর্যোগভিত্তিক বীমা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, প্যারামেট্রিক বীমার আধুনিক ও সহজলভ্য ব্যবহার বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কাঠামো গড়ে তোলা না যায়, তবে ভবিষ্যতের যেকোনো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বাংলাদেশের জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী ও অপূরণীয় অর্থনৈতিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
