বাংলাদেশের আধুনিক ও জনপ্রিয় সঙ্গীতের ইতিহাসে মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান, যিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে আজম খান নামে সুপরিচিত, এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি একাধারে ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনোত্তর বাংলাদেশের পপ ও ব্যান্ড সঙ্গীতের প্রধান পথপ্রদর্শক। সংগীতাঙ্গনে অনন্য অবদানের জন্য তাঁকে ‘পপসম্রাট’ এবং ‘গুরু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র হাতে শত্রুসেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পর, স্বাধীন দেশে তিনি সুরের মূর্ছনা দিয়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেন। বাংলা গানের জগতে তাঁর কালজয়ী সৃষ্টির মধ্যে ‘রেল লাইনের ঐ বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’ এবং ‘আসি আসি বলে’ অন্যতম। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর প্রথম সংগীতানুষ্ঠান বা কনসার্ট প্রচারিত হয়, যা দেশের সমকালীন সঙ্গীতাঙ্গনে এক নতুন ও আধুনিক যুগের সূচনা করেছিল।
আজম খানের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি ও শিক্ষাজীবন
১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন আজম খান। তাঁর পারিবারিক ও শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাদি নিচে ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যাদি |
| পিতা ও মাতা | মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান (প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক) এবং জোবেদা খাতুন। |
| সহোদর ভাই-বোন | বড় ভাই সাইদ খান, মেজ ভাই আলম খান (সুরকার), ছোট ভাই লিয়াকত আলী খান (মুক্তিযোদ্ধা) এবং ছোট বোন শামীমা আক্তার খানম। |
| প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা | আজিমপুর ঢাকেশ্বরী স্কুল এবং কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুল। ১৯৬৮ সালে সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাস। |
| উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা | ১৯৭০ সালে টি অ্যান্ড টি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষা পাস। |
| স্ত্রী ও সন্তান সন্ততি | স্ত্রী শাহেদা বেগম। তিন সন্তান হলেন ইমা, হৃদয় এবং অরণী। |
১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকেই আজম খান পাকিস্তানি শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সক্রিয় অবস্থান নেন। তিনি ‘ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী’র একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে বিভিন্ন স্থানে গণসঙ্গীত পরিবেশন করে সাধারণ মানুষকে স্বাধিকার আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করতেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পিতার অনুপ্রেরণায় তিনি সরাসরি সশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন। দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে পায়ে হেঁটে তিনি ভারতের আগরতলায় পৌঁছান এবং ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের যোগ্য নেতৃত্বে যুদ্ধ শুরু করেন। ভারতের মেলাঘর প্রশিক্ষণ শিবিরে কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর তিনি কুমিল্লার সালদায় প্রথম সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তীতে উচ্চতর গেরিলা যুদ্ধের জন্য তাঁকে ঢাকা ও এর আশপাশের অঞ্চলে পাঠানো হয়।
মাত্র ২১ বছর বয়সে আজম খান ২ নম্বর সেক্টরের একটি সেকশনের কমান্ডার বা দলনেতা হিসেবে ঢাকার অভ্যন্তরে একাধিক অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ গেরিলা অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত ‘অপারেশন তিতাস’ নামক বিশেষ অভিযানটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার প্রধান গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল এবং হোটেল পূর্বাণীর গ্যাস সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা, যাতে আন্তর্জাতিক মহল বুঝতে পারে যে বাংলাদেশে একটি তীব্র মুক্তিযুদ্ধ চলছে। মাদারটেকের ত্রিমোহনী যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে স্বাধীন ঢাকায় প্রবেশ করেন। যুদ্ধ চলাকালীন তিনি বাম কানে গুরুতর আঘাত পান, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর শ্রবণশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। দীর্ঘ দিন ক্যান্সারের সাথে বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের পর ২০১১ সালের ৫ জুন এই মহান শিল্পী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা হিসেবে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
