হবিগঞ্জে কর্মস্থল থেকে ফেরার পথে নারীর মুখে এসিড নিক্ষেপ

হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় এক নারী শ্রমিকের মুখমণ্ডলে ক্ষতিকারক দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করার অভিযোগ উঠেছে তাঁরই সাবেক স্বামীর বিরুদ্ধে। এই নৃশংস হামলার কারণে ওই নারীর মুখমণ্ডলের এক অংশ মারাত্মকভাবে ঝলসে গেছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় এবং উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন বিবেচনা করে তাঁকে রাজধানী ঢাকার জাতীয় দগ্ধ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাত ৯টার দিকে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বড় বহুলা নামক এলাকায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। হামলার শিকার ওই নারী শ্রমিকের নাম রুবিনা আক্তার (২৮)। তিনি বড় বহুলা এলাকার একজন স্থায়ী বাসিন্দা এবং স্থানীয় ‘প্রাণ’ নামক একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

ভুক্তভোগী ও অভিযুক্তের পারিবারিক ও সামাজিক বিবরণ

পুলিশ ও স্থানীয় নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনার সুনির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিবরণ নিচে ছকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো:

ক্রমিক সংখ্যাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিসামাজিক ও পারিবারিক পরিচয়ঘটনার পূর্ব ইতিহাস
রুবিনা আক্তার (২৮)ভুক্তভোগী নারী শ্রমিক, বড় বহুলা এলাকা, হবিগঞ্জ সদর।ছয় মাস পূর্বে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে এবং সাবেক স্বামী কর্তৃক উত্যক্ত হচ্ছিলেন।
উজ্জল মিয়াঅভিযুক্ত সাবেক স্বামী, আনন্দপুর গ্রাম (মৃত আব্দুল বারিকের ছেলে)।বিবাহবিচ্ছেদের পর থেকে ক্ষুব্ধ হয়ে সাবেক স্ত্রীর ওপর নজর রাখছিলেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশি তদন্তে জানা যায়, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার আনন্দপুর গ্রামের মৃত আব্দুল বারিকের ছেলে উজ্জল মিয়ার সাথে রুবিনা আক্তারের বিবাহ হয়েছিল। বিবাহিত জীবনে পারস্পরিক কলহ ও পারিবারিক অশান্তি ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আনুমানিক ছয় মাস পূর্বে আইনগত ও ধর্মীয় বিধি মোতাবেক তাঁদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক সম্পন্ন হয়। তবে এই বিচ্ছেদকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি উজ্জল মিয়া। তালাক কার্যকর হওয়ার পর থেকেই তিনি রুবিনা আক্তারের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং বিভিন্ন সময় রাস্তাঘাটে চলাচলের পথে তাঁকে উত্যক্ত, হয়রানি ও মানসিক নির্যাতন করে আসছিলেন।

ঘটনার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার রাতে রুবিনা আক্তার তাঁর কর্মস্থল কারখানা থেকে দৈনিক কাজ সমাপ্ত করে সাধারণ নিয়মে হেঁটে নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। তিনি যখন বড় বহুলা এলাকায় নিজ বাসভবনের সন্নিকটে পৌঁছান, তখন সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অন্ধকারে ওৎ পেতে থাকা সাবেক স্বামী উজ্জল মিয়া হঠাৎ তাঁর গতিপথ রোধ করে এবং আকস্মিকভাবে তাঁর মুখমণ্ডল লক্ষ্য করে তীব্র এসিড বা এসিড জাতীয় ক্ষতিকারক দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করে। দাহ্য পদার্থের তীব্র দহনে রুবিনা আক্তার চিৎকার শুরু করলে তাঁর আর্তনাদে আশপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয় জনগণের আগমন টের পেয়ে অভিযুক্ত উজ্জল মিয়া অন্ধকার সুযোগ নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে আত্মগোপন করে।

উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা অত্যন্ত গুরুতর ও দগ্ধ অবস্থায় রুবিনা আক্তারকে উদ্ধার করে কালক্ষেপণ না করে হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকলে এবং ক্ষত গভীর হওয়ায় সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার জাতীয় দগ্ধ ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের জরুরি পরামর্শ দেন। চিকিৎসকদের নির্দেশনা মোতাবেক রাতেই তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়।

এই ঘটনার পর থেকে বড় বহুলা এবং আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে হবিগঞ্জ সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শহিদুল হক মুন্সী সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে এক নারীর মুখের এক পাশে এসিড বা এসিড জাতীয় মারাত্মক দাহ্য পদার্থ নিক্ষেপ করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “আমরা পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছি। এই অপরাধের সাথে জড়িত প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে সুনির্দিষ্টভাবে সনাক্ত করা হয়েছে, তাঁকে দ্রুত গ্রেফতারের জন্য পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”