প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের বিশেষ কৃষি ঋণ সুবিধা দিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা এবং প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিদের প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ঋণ প্রাপ্তির পথ সুগম করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক নীতিমালা জারি করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পুনরর্থায়ন বা পুনর্বহাল অর্থায়ন প্রকল্পের আওতায় এই নতুন সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। এর অধীনে যেসব কৃষকের কাছে বৈধ ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ রয়েছে, তাঁরা প্রাতিষ্ঠানিক কৃষি ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রাধিকার লাভ করবেন। ২০২৬ সালের জুন মাসের প্রথম মঙ্গলবারে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য এই সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারিকৃত নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রস্তাবিত ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড নীতিমালা-২০২৫’ এর সাথে পূর্ণ সংগতি রেখে সকল বাণিজ্যিক ও তফসিলি ব্যাংককে কাজ করতে হবে। এই নির্দেশনার আলোকে কার্ডধারী কৃষকদের ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনতে মাত্র ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাঁদের ঋণ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রথম সারিতে রাখতে হবে। তবে একই সাথে প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছে যে, যেসব কৃষকের কাছে এখনো এই বিশেষ স্মার্ট কার্ডটি পৌঁছায়নি, তাঁদের যেন কোনোভাবেই ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত না করা হয়। অর্থাৎ, কার্ড না থাকলেও প্রকৃত প্রান্তিক ও ভূমিহীন চাষিরা যাতে এই পুনরর্থায়ন তহবিলের ঋণ সুবিধা সমানভাবে পান, তা ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে।

প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাসমূহ এবং ঋণের লক্ষ্যমাত্রা

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বিশেষ প্রজ্ঞাপনে সাম্প্রতিক সময়ের তীব্র গ্রীষ্মকালীন শিলাবৃষ্টি ও ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জরুরি ভিত্তিতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায়, পেকে যাওয়া ধান এবং অন্যান্য দণ্ডায়মান ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এই বিশাল আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠে কৃষকরা যাতে পুনরায় তাঁদের চাষাবাদ শুরু করতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে কিছু নির্দিষ্ট জেলাকে বিশেষ অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জেলাসমূহফসলের ক্ষয়ক্ষতির প্রধান কারণ ও প্রকৃতিপুনরর্থায়ন সহায়তার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য
সিলেট, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জহাওর অঞ্চলে গ্রীষ্মকালীন আকস্মিক বন্যা ও ভারী বর্ষণে পেকে যাওয়া বোরো বা আউশ ধানের ব্যাপক ক্ষতি।কৃষকদের দোরগোড়ায় দ্রুততম সময়ে কার্যকরী মূলধন পৌঁছে দেওয়া।
কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহনিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে দণ্ডায়মান ফসলের বিনাশ এবং চাষিদের আর্থিক বিপর্যয়।কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়াই কৃষকদের নতুন করে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ ক্রয়ের সুবিধা দেওয়া।
অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ-কবলিত জেলাসমূহআকস্মিক আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামীণ কৃষি খাত।গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনযাত্রা সচল রাখা এবং কৃষি উৎপাদন পুনরায় শুরু করা।

দেশব্যাপী কৃষক স্মার্ট কার্ডের পরিধি ও রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, বিদ্যমান পুনরর্থায়ন ঋণ প্রকল্পের অন্যান্য সমস্ত সাধারণ শর্তাবলী পূর্বের নিয়ম অনুসারেই অপরিবর্তিত থাকবে। উল্লেখ্য, সরকারের পক্ষ থেকে কৃষি খাতের বিভিন্ন সরকারি ভর্তুকি, স্বল্প সুদের ঋণ এবং অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা সরাসরি প্রকৃত কৃষকের হাতে পৌঁছে দেওয়ার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে দেশব্যাপী কৃষক স্মার্ট কার্ড বিতরণের মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, আগামী চার বছরের মধ্যে দেশের প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ বা ১৬.৫ মিলিয়ন কৃষককে এই ডিজিটাল কার্ড ব্যবস্থার আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

এই অনন্য ডিজিটাল কার্যক্রমের পরিধি কেবল শস্য উৎপাদনকারী কৃষকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। গ্রামীণ অর্থনীতির সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে দেশের প্রান্তিক মৎস্যজীবী এবং দুগ্ধ খামারিদেরও পর্যায়ক্রমে এই ডিজিটাল কার্ডের আওতায় নিয়ে আসা হবে। এই উদ্যোগের মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য হলো রাষ্ট্রীয় সুবিধা লাভের ক্ষেত্রে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধাগুলো চিরতরে দূর করা। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রতিকূল আবহাওয়ার মাঝে গ্রামীণ মানুষের জীবনজীবিকা রক্ষা করা, তাঁদের আর্থিক সহনশীলতা বৃদ্ধি করা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই ঋণ সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করেছে।