বিকেলের সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ে এবং সন্ধ্যার আগমনী বার্তায় চারপাশ ক্রমশ আবছা হতে থাকে, তখন মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরপারে এক চিরচেনা দৃশ্যের অবতারণা হয়। বিস্তীর্ণ জলরাশি, ভাসমান ঘাস আর নানা জাতের জলজ উদ্ভিদের বুক চিরে ছোট ছোট মাছ ধরার নৌকাগুলো সারিবদ্ধভাবে তীরের দিকে ধেয়ে আসে। দিনশেষে নিজেদের জালে ধরা পড়া হরেক রকমের তরতাজা দেশীয় ছোট মাছ নিয়ে মৎস্যজীবীরা ঘাটে এসে সমবেত হন। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের খইশাউড়া গ্রামের সন্নিকটে প্রতি রবিবার বিকেলে স্থানীয় মৎস্যজীবী ও পাইকারদের উপস্থিতিতে এক ব্যতিক্রমী মাছের বাজার বসে।
ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে এই স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্থানীয়দের কাছে এটি ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ও একাটুনা ইউনিয়ন দুটি ভিন্ন দিক থেকে এসে ঠিক এই খইশাউড়া গ্রামে মিলিত হয়েছে। এই মিলনস্থলের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে তিনটি গ্রাম—করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া। স্থানীয় বাসিন্দারা নিজস্ব পছন্দ অনুযায়ী এই তিন গ্রামের যেকোনো একটির নামেই স্থানটিকে সম্বোধন করে থাকেন।
কালভার্টের অস্থায়ী বাজার ও বেচাকেনার চিত্র
পড়ন্ত বিকেলে যখন গ্রামের ইট-সুরকি বিছানো পথ ও কাদামাটির রাস্তায় বাড়িঘরের দীর্ঘ ছায়া পড়ে, তখন করমউল্লাহপুর গ্রামের একটি কালভার্টের ওপর নানাবয়সী মানুষের ব্যাপক সমাগম ঘটে। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমের মধ্যে কাউয়াদীঘি হাওর থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া উপভোগ করতে অনেকেই এখানে আসেন। তবে এই কালভার্টটি কেবল সাধারণ মানুষের আড্ডাস্থল নয়, এটি মূলত হাওরের তরতাজা ছোট মাছ কেনাবেচার একটি অত্যন্ত ব্যস্ত পাইকারি বাজার।
জেলেরা হাওর থেকে মাছ ধরে সরাসরি এই কালভার্টের কাছে নিয়ে আসেন। কেউ মাছের বিশেষ পাত্র বা ডোলা কাঁধে করে আসেন, আবার কেউ মাছ বিক্রি শেষ করে নিজ গৃহের পানে ছুটে যান। এখানে মাছের আগমন অবিরাম চলতে থাকে। আর সেই সংগৃহীত মাছ কেনার জন্য পাইকারি ক্রেতারা বিক্রেতাদের চারপাশে ভিড় জমান। দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পর পাইকারেরা মাছ কিনে বড় প্লাস্টিকের ক্যারেট এবং বেতের বিশেষ ঝুড়িতে জমা করতে থাকেন।
করমউল্লাহপুর গ্রামের বাসিন্দা রেনু মিয়া ও দুরুদ মিয়ার প্রদত্ত তথ্যমতে, এই বাজারটি সম্পূর্ণভাবে একবেলার পাইকারি বাজার। বিকেল চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথেই বাজারটি ভেঙে যায়। এই অল্প সময়ের মধ্যে হাওরে যাওয়া প্রায় সকল জেলেই মাছ নিয়ে ঘাটে ফিরে আসেন। এখানকার ক্রেতা ও বিক্রেতাদের সিংহভাগই করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া—এই তিন গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দা। এই হাট থেকে কেনা মাছগুলো পরবর্তীতে খুচরা বিক্রেতারা মৌলভীবাজার শহরের টিসি মার্কেট এবং পশ্চিম বাজারে নিয়ে সাধারণ ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করেন।
বাজারে প্রাপ্ত মাছের প্রজাতি ও মৎস্যজীবীদের কর্মব্যস্ততা
কাউয়াদীঘি হাওরের এই অস্থায়ী বাজারে মূলত দেশীয় প্রজাতির হরেক রকমের ছোট মাছের আধিক্য দেখা যায়। বাজারে নিয়মিত পাওয়া যায় এমন প্রধান প্রধান মাছের তালিকা এবং মৎস্যজীবীদের কর্মযজ্ঞের বিবরণ নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| বাজারে প্রাপ্ত মাছের প্রকারভেদ | মৎস্যজীবীদের দৈনিক কর্মতালিকা | প্রতিদিন চলাচলকারী নৌকার সংখ্যা | প্রধান বিক্রয়কেন্দ্র |
| মলা, পুঁটি, ট্যাংরা, কই, মেনি, খইয়া, চ্যাং, চাঁদাসহ বিভিন্ন দেশীয় ছোট মাছ। | প্রথম দফা: দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফা: শেষ রাত ৩টা থেকে সকাল পর্যন্ত। | করমউল্লাহপুর, কালাইপুরা ও খইশাউড়া গ্রাম থেকে প্রতিদিন প্রায় ১৫০ থেকে ২০০টি নৌকা হাওরে যায়। | মৌলভীবাজার শহরের টিসি মার্কেট এবং পশ্চিম বাজার। |
স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবনজীবিকা ও অভিজ্ঞতার বিবরণ
হাওর থেকে মাছ ধরে ঘাটে ফেরার পথে খইশাউড়া গ্রামের মোশারফ মিয়ার সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি দুপুর দুইটার দিকে হাওরে যান এবং বিকেল ছয়টার মধ্যে মাছ ধরে বাজারে ফিরে আসেন। তাঁর কাঁধের ঝুড়িতে থাকা মলাসহ বিভিন্ন জাতের তরতাজা মাছের আনুমানিক বাজারমূল্য পাঁচ-ছয় শ টাকা। তিনি প্রায় প্রতিদিনই এই নির্দিষ্ট সময়ে হাওরে মাছ শিকার করেন।
একই গ্রামের আরেকজন মৎস্যজীবী তানজিল হাসান নৌকার পাটাতন থেকে পানি ও মাছগুলো প্লাস্টিকের ক্যারেটে তুলতে তুলতে জানান, তিনি এবং তাঁর সহযোগী দুপুর দুইটার পর পাতা জাল নিয়ে হাওরে গিয়েছিলেন। তাঁদের সংগৃহীত মাছের মূল্যও প্রায় পাঁচ থেকে সাত শ টাকা। এই মাছ কালভার্টের বাজারে বিক্রি শেষ করে, তাঁরা আবার শেষ রাত তিনটার দিকে দ্বিতীয় দফায় নৌকা নিয়ে মাছ ধরার জন্য হাওরের উদ্দেশ্যে রওনা হবেন।
স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এই অঞ্চলের তিনটি গ্রামের একটি বড় অংশের মানুষের প্রধান জীবিকা হলো মৎস্য শিকার। বিশেষ করে বর্ষাকালে যখন কাউয়াদীঘি হাওর পানিতে পরিপূর্ণ থাকে, তখন তাঁদের ব্যস্ততা বহুগুণ বেড়ে যায়। প্রতিটি নৌকায় সাধারণত একজন বা দুজন করে মৎস্যজীবী থাকেন। কেউ বিকেলে মাছ ধরেন, আবার কেউ সন্ধ্যার সময় হাওরের নির্দিষ্ট স্থানে ছোট মাছ ধরার জাল পেতে রেখে আসেন এবং শেষ রাতে গিয়ে সেই মাছ সংগ্রহ করেন। হাওরে যতদিন পানি থাকে, এই অঞ্চলের মানুষের মাছ ধরা ও বিক্রির এই চিরচেনা জীবনচক্রটি একটি নিয়মের মতো অবিরত চলতে থাকে। শেষবেলায় যখন সন্ধ্যার ছায়া ঘন হয়ে আসে, তখন বেচাকেনা শেষ করে খুচরা বিক্রেতারা শহরের বাজারের দিকে রওনা হন এবং হাওরপার আবার শান্ত রূপ ধারণ করে।
