ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তানিম নূর পরিচালিত বহুল আলোচিত চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনার প্রতিবাদে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নির্মাতা, অভিনয়শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সাধারণ দর্শকদের পর এবার এই সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নতুন প্রজন্মের জনপ্রিয় অভিনেত্রী রুকাইয়া জাহান চমক।
সোমবার (১ জুন) রাত ৯টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া একটি স্ট্যাটাসে এই অভিনেত্রী প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘প্রশাসন ধর্ষণ থামাতে পারে না, কিন্তু সিনেমার প্রদর্শনী ঠিকই থামাতে পারে। যে দেশে সুর নাই, সে দেশে তো অসুরই তৈরি হবে।’
অভিনেত্রী চমকের এই মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর তা দ্রুততার সাথে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তাঁর এই বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং অবাধ সাংস্কৃতিক চর্চার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
Table of Contents
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় প্রদর্শনী বন্ধের প্রেক্ষাপট ও মূল ঘটনা
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটির উদ্যোগে স্থানীয় অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটির একটি বিশেষ প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক আয়োজন করা হয়েছিল। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় ও বৈধ লিখিত অনুমতি গ্রহণ করেই প্রদর্শনীর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল।
তবে প্রদর্শনীর পূর্বমুহূর্তে স্থানীয় একটি বিশেষ মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলচ্চিত্রটির বিষয়বস্তু নিয়ে নানাবিধ আপত্তি তুলে নেতিবাচক প্রচারণা শুরু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে একপর্যায়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ভেন্যু বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের দেওয়া পূর্বানুমতি আকস্মিকভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। যার ফলে শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত প্রদর্শনীটি সম্পূর্ণ স্থগিত করতে বাধ্য হন আয়োজকেরা।
কসবাতেও বন্ধ হলো প্রদর্শনী
একই দিনে জেলার কসবা উপজেলার তালতলা গ্রামেও স্থানীয় তরুণদের নিজস্ব উদ্যোগে এই চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের আরেকটি সমান্তরাল আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে প্রদর্শনীটি বন্ধ করে দেওয়া হয় বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
১০টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের যৌথ উদ্বেগ ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ
চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী এভাবে বারবার বন্ধ করে দেওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বনামধন্য ১০টি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন। সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো একটি যৌথ বিবৃতিতে এই ঘটনাটিকে মুক্ত সাংস্কৃতিক চর্চার পরিপন্থী এবং নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য একটি অশনিসংকেত বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ উল্লেখ করেন যে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাটি দীর্ঘকাল ধরে প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উর্বর ভূমি হিসেবে দেশব্যাপী সমাদৃত ও পরিচিত। ওস্তাদ আলাউদ্দীন খাঁ এবং কবি আল মাহমুদের মতো বিশ্বখ্যাত গুণীজনদের স্মৃতিধন্য এই জেলায় রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত একটি স্বাধীন চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী বন্ধ হয়ে যাওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক এবং নিন্দনীয়।
সংস্কৃতিকর্মী ও সংগঠনগুলোর নেতারা আরও তথ্য প্রদান করে জানান যে:
‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ‘বাংলাদেশ ফিল্ম Certification বা সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩’ এর সকল আইনি ধারা ও বিধিমালা অনুসরণ করেই প্রদর্শনের জন্য বৈধ অনুমতি বা সেন্সর সনদপত্র লাভ করেছে।
ইতিমধ্যে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চলচ্চিত্রটি সফলভাবে প্রদর্শিত হয়েছে এবং সর্বমহলে ব্যাপক প্রশংসাও কুড়িয়েছে।
অথচ অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, এই চলচ্চিত্রের মূল নির্মাতা তানিম নূর, যিনি নিজেও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একজন কৃতি সন্তান, তিনি আইনি অনুমতি থাকা সত্ত্বেও নিজের জন্মভূমিতে তার নির্মিত চলচ্চিত্রটি সাধারণ মানুষের সামনে প্রদর্শনের ন্যূনতম সুযোগ পেলেন না।
অবাধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি
যৌথ বিবৃতিতে চলচ্চিত্রকে সমাজের দর্পণ এবং একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পমাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, শিল্প-সাহিত্য ও সুস্থ সংস্কৃতির অবাধ চর্চা নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সমাজের অন্যতম প্রধান শর্ত। কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অযৌক্তিক অসহনশীলতা বা উগ্র মনোভাবের কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া অনুশীলন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী জেলা সংসদ, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, আবরণী, কবির কলম, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, সোনালি সকাল এবং আজকের সংস্কৃতি সংগঠনসহ মোট ১০টি শীর্ষস্থানীয় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন যৌথভাবে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছে।
এদিকে, এই ঘটনার পর রুকাইয়া জাহান চমকের দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসটি এই সেন্সরশিপের বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। তার এই সময়োপযোগী বক্তব্যে দেশের আপামর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বরা সমর্থন জানিয়ে বলছেন যে, দেশে সুস্থ শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চার ধারা অব্যাহত রাখতে হলে অবিলম্বে একটি সহনশীল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
