বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের শীর্ষ নেতা এবং সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ মৃত্যুবরণ করেছেন। সোমবার (১ জুন) বিকেল ৪টার দিকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে এই বর্ষীয়ান রাজনীতিকের বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। পারিবারিক সূত্র ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের বরাত দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে তোফায়েল আহমেদ বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, পূর্বে স্ট্রোকজনিত কারণে তাঁর শরীরের একটি অংশ অবশ হয়ে গিয়েছিল এবং বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে তিনি হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতেন। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে দীর্ঘদিন তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। অবশেষে চিকিৎসকদের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১ জুন বিকেলে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তোফায়েল আহমেদের রাজনৈতিক জীবন ও অবদান
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তোফায়েল আহমেদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উজ্জ্বল নাম। ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্রনেতা হিসেবে দেশব্যাপী ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন।
তিনি ছিলেন ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মহানায়ক। তৎকালীন সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি হিসেবে তিনি এই ছাত্র আন্দোলনের অগ্রসৈনিকের ভূমিকা পালন করেন, যা বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রামকে বেগবান করেছিল। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ঐতিহাসিক গণসমাবেশে তৎকালীন ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আনুষ্ঠানিকভাবে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ (যা মুজিব বাহিনী নামেও পরিচিত) গঠনে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষিত করার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন।
স্বাধীনতার পর তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে জাতীয় রাজনীতিতে বহু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ভোলার বিভিন্ন আসন থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হন। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিসভায় বিভিন্ন মেয়াদে অত্যন্ত সফলতার সাথে শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
তোফায়েল আহমেদের জীবনবৃত্তান্ত এক নজরে
নিচে তোফায়েল আহমেদের জীবন, শিক্ষা, রাজনৈতিক পদ ও অবদানের সংক্ষিপ্ত বিবরণ একটি তালিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | বিষয়ের বিবরণ | সংশ্লিষ্ট তথ্য ও ঐতিহাসিক বিবরণ |
| ১. | জন্ম ও স্থান | ২২ অক্টোবর ১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ; কোরালিয়া গ্রাম, ভোলা জেলা। |
| ২. | শিক্ষা ও ছাত্র রাজনীতি | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ডাকসুর সাবেক সহ-সভাপতি (ভিপি)। |
| ৩. | ঐতিহাসিক অবদান (১৯৬৯) | ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রধান নেতৃত্বদানকারী এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদানকারী। |
| ৪. | মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা (১৯৭১) | মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং মুজিব বাহিনীর শীর্ষ অধিনায়ক। |
| ৫. | সংসদীয় ও রাষ্ট্রীয় পদ | একাধিকবার নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য এবং সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী। |
| ৬. | মৃত্যু ও স্থান | ১ জুন; বিকেল ৪:০০ ঘটিকা, স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা। |
| ৭. | মৃত্যুকালীন বয়স | ৮২ বছর। |
তোফায়েল আহমেদের প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। অবসান ঘটলো বাংলাদেশের ইতিহাসের এক উত্তাল অধ্যায়ের সাক্ষী ও রূপকারের।
