প্রেমের ফাঁদে কলেজছাত্রকে নৃশংস হত্যা: নেপথ্যে পিবিআই

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শীর্ষক একটি তথ্যগ্রন্থে মাদারীপুরের শিবচরের একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে। ২০২১ সালের মে মাসে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিনে সংঘটিত এই অপরাধের শিকার হয়েছিলেন ইসমাইল হোসেন ওরফে ইমন নামের এক তরুণ, যিনি ঢাকার একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উচ্চতর শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। পিবিআইয়ের তদন্ত এবং ধৃত আসামির জবানবন্দির ভিত্তিতে জানা গেছে যে, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ছিলেন ইমনেরই সাবেক প্রেমিকা, যিনি তৎকালীন সময়ে একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করতেন।

ঘটনার নেপথ্য কারণ ও বিবাদের সূত্রপাত

তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ইমনের সঙ্গে উক্ত তরুণীর একটি গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সেই সময়ে পারস্পরিক সম্পর্কের সূত্র ধরে কিছু অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ ছবি এবং ভিডিও চিত্র ইমনের মুঠোফোনে সংরক্ষিত ছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁদের মধ্যকার এই প্রেমের বিচ্ছেদ ঘটে এবং ওই তরুণীর পরিবার অন্য এক পাত্রের সঙ্গে তাঁর বিবাহ স্থির করে। এই খবর জানতে পেরে ইমন পুনরায় তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য একপ্রকার বাধ্য করেন। একই সাথে ইমন হুমকি প্রদান করেন যে, তাঁর কথামতো সাক্ষাৎ না করলে পূর্বের সেই সমস্ত ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও চিত্র ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দিয়ে তাঁর সামাজিক ও পারিবারিক জীবন বিনষ্ট করে দেওয়া হবে। এই ধরণের ব্ল্যাকমেইল ও হুমকির মুখে পড়ে নিজের আসন্ন বিবাহ রক্ষা এবং সামাজিক সম্মান বাঁচানোর তাগিদে তরুণী ইমনকে চিরতরে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এই অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে তিনি তাঁর হবু স্বামী কামরুজ্জামান, নিজের আপন চাচা তোবারক ফরাজী এবং অন্য একজন তরুণীকে সহযোগী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন।

পরিকল্পিত মৃত্যুফাঁদের বিবরণ ও ঘটনাপ্রবাহ

২০২১ সালের ১৩ই মে, পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন বিকেলে এই হত্যাকাণ্ডটি সম্পন্ন করা হয়। অপরাধটি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য ঘাতক চক্র প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ধাপে ধাপে একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা মৃত্যুফাঁদ তৈরি করেছিল। সমগ্র হত্যাকাণ্ডটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে আসামিদের আনুমানিক সাড়ে চার ঘণ্টা সময় লেগেছিল।

হত্যাকাণ্ডের দিন দুপুরের পর থেকে অপরাধের চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত ধারাবাহিক ঘটনাপ্রবাহ নিচে একটি সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

পর্যায়সময়নির্দিষ্ট স্থান ও ঘটনার বিবরণ
প্রথমবেলা ৩:৫০ মিনিটশিবচরের ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী ডিগ্রি কলেজ মাঠে ইমনের সাথে মূল পরিকল্পনাকারী তরুণী এবং তাঁর নারী সহযোগীর পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাৎ ঘটে।
দ্বিতীয়প্রস্তুতি পর্বএই সাক্ষাতের পূর্বেই শিবচরের সূর্যনগর মোড় নামক স্থান থেকে অন্য সহযোগীরা ওই তরুণীর কাছে একটি ধারালো ছুরি এবং চেতনানাশক বা ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত কোমল পানীয় পৌঁছে দেয়।
তৃতীয়বিষপ্রয়োগকলেজ মাঠে আড্ডার ছলে ইমনকে সেই ঘুমের ওষুধ মিশ্রিত পানীয়টি পানের জন্য দেওয়া হয় এবং তা পানের পর ইমন ক্রমান্বয়ে অবশ ও দুর্বল হয়ে পড়েন।
চতুর্থস্থান পরিবর্তনঅর্ধসচেতন অবস্থায় ইমনকে একটি অটোরিকশায় করে আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী পুরোনো ফেরিঘাটের নির্জন এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।
পঞ্চমচূড়ান্ত আক্রমণনদীর পাড়ে বসে ছবি ও ভিডিও ফেরত দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে চরম বাগ্বিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তরুণী নিজে ছুরি বের করে ইমনের গলায় দুই বার আঘাত করেন এবং পরবর্তীতে হবু স্বামী কামরুজ্জামান ছুরিটি নিয়ে পুনরায় উপর্যুপরি আঘাত করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
ষষ্ঠলাশ গুমহত্যাকাণ্ড শেষে অপরাধের প্রমাণ ও আলামত সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে ঘাতকেরা ইমনের মৃতদেহটি আড়িয়াল খাঁ নদের স্রোতে ভাসিয়ে দেয়।

লাশ উদ্ধার, তদন্ত এবং আইনি অগ্রগতি

হত্যাকাণ্ডের পরদিন অর্থাৎ ১৪ই মে সন্ধ্যায় শিবচরের সন্ন্যাসীরচর ইউনিয়নের খাসচর বাঁচামারা এলাকার আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে ভাসমান অবস্থায় ইমনের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করে স্থানীয় পুলিশ। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলার প্রাথমিক তদন্তভার শিবচর থানা-পুলিশের ওপর ন্যস্ত থাকলেও, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে জটিলতা দেখা দেওয়ায় মামলার দায়িত্বভার পিবিআইয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

পিবিআই দায়িত্ব নেওয়ার পর অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করে এবং ঈদের দিন ইমনের গতিবিধি, মোবাইল ফোনের অবস্থান এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারীদের যাতায়াতের পথ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে। এই তদন্তের সূত্র ধরে মূল পরিকল্পনাকারী তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর বিজ্ঞ আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় নিজের অপরাধ স্বীকার করে একটি বিস্তারিত জবানবন্দি প্রদান করেন।

পিবিআইয়ের প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল এই ঘটনা প্রসঙ্গে জানিয়েছেন যে, এটি কোনো তাত্ক্ষণিক উত্তেজনা কিংবা আকস্মিক ঝগড়ার ফল ছিল না। এটি ছিল নিখুঁত ও ঠান্ডা মাথায় করা একটি সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। ইমনকে মূলত পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি ফাঁদে ফেলে ডেকে আনা হয়েছিল এবং এই অপরাধচক্রের প্রত্যেক সদস্যের নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করা ছিল, যা তাঁরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় বাস্তবায়ন করেছেন।