খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ই জুলাই ২০২৬, ১১:১০ পিএম

এইচএসসি পরীক্ষায় বড় ধরনের এক নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনার ঘটনা ঘটেছে বগুড়ায়। জেলার শিবগঞ্জ সরকারি এমএইচ কলেজ কেন্দ্রের একটি কক্ষে চলতি এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ২০২৬ সালের পরিবর্তে ২০২৫ সালের (মানোন্নয়ন বা ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত) প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত বুধবার (১৫ জুলাই) অনুষ্ঠিত মানবিক বিভাগের ‘যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্র’ পরীক্ষায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি ঘটে। এর ফলে ওই কক্ষের ৪২ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থী ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা সম্পন্ন করায় তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর যখন তারা ভুলটি বুঝতে পারে, তখন পুরো কেন্দ্রজুড়ে এক থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
জানা গেছে, শিবগঞ্জ সরকারি এমএইচ কলেজ কেন্দ্রের ১০৭ নম্বর কক্ষে মোট ৫০ জন পরীক্ষার্থীর আসন ছিল। এদের মধ্যে ৭ জন ছিল ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের এবং বাকি ৪৩ জন ছিল মানবিক বিভাগের যুক্তিবিদ্যা বিষয়ের পরীক্ষার্থী। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর কক্ষে দায়িত্বরত শিক্ষকেরা ভুলবশত ৪৩ জনের মধ্যে ৪২ জন পরীক্ষার্থীর হাতে ২০২৬ সালের নিয়মিত প্রশ্নপত্রের বদলে ২০২৫ সালের অনিয়মিত বা ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র তুলে দেন। মাত্র ১ জন পরীক্ষার্থী সঠিক অর্থাৎ ২০২৬ সালের প্রশ্নপত্র পেয়েছিল।
পরীক্ষার্থীরা না বুঝেই পুরো সময় ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দেয়। পরীক্ষা একদম শেষ হওয়ার পর খাতা জমা নেওয়ার সময় বিষয়টি দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের নজরে আসে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে কর্মকর্তারা দ্রুত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভুল প্রশ্নপত্রগুলো কেড়ে নেন এবং তাদের হাতে তড়িঘড়ি করে ২০২৬ সালের সঠিক প্রশ্নপত্র ধরিয়ে দিয়ে কেন্দ্র থেকে বিদায় করেন। এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। তাদের অভিযোগ, পুরো তিন ঘণ্টা ভুল সিলেবাসের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে এখন তারা ফলাফলের মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এই চরম দায়িত্বহীনতার বিষয়ে মোকামতলা মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পরীক্ষার মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল জায়গায় এমন ভুল কোনোভাবেই সাধারণ বা ক্ষমার যোগ্য ভুল হতে পারে না। প্রশ্নপত্র বিতরণের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের চরম অবহেলা এবং উদাসীনতার কারণেই কয়েক ডজন শিক্ষার্থীর জীবন আজ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, শিবগঞ্জ সরকারি এমএইচ কলেজের অধ্যক্ষ এবং কেন্দ্র সচিব আবুল কালাম আসাদ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন:
“এটি মূলত ভুলবশত ঘটে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী পরীক্ষা শুরুর আগে থানা থেকে আজকের প্রশ্নপত্র কেন্দ্রে আনা হয়। সেখানে নিয়মিত (২০২৬) ও মানোন্নয়ন (২০২৫) উভয় ব্যাচের প্রশ্নপত্রই ছিল। প্রশ্নগুলো সাজানো এবং বিভিন্ন কক্ষে বিতরণের জন্য আমাদের ৫ সদস্যের একটি শক্তিশালী কমিটি রয়েছে। কিন্তু অসাবধানতাবশত কমিটির লোকজন ১০৭ নম্বর কক্ষে ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রের ৪২টি কপি পাঠিয়ে দেন এবং শিক্ষকেরাও তা খেয়াল না করে বিলি করে দেন।”
অধ্যক্ষ আরও দাবি করেন, পরীক্ষা চলাকালে তিনি নিজেই ওই কক্ষটি তিনবার পরিদর্শন করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেই সময়ে কোনো পরীক্ষার্থী কিংবা কক্ষে দায়িত্বরত পরিদর্শক শিক্ষক বিষয়টি তাঁর নজরে আনেননি।
ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হলেও পরীক্ষার্থীদের কোনো ক্ষতি হবে না বলে আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্র সচিব। তিনি জানান, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরেই তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডকে (রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড) লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ওই ৪২ জন শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র বা খাতা ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রের সমাধান অনুসারেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করা হবে। ফলে ভুল প্রশ্নে পরীক্ষা দিলেও নম্বরের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের লোকসান গুণতে হবে না।
তবে বিষয়টি হালকাভাবে নিচ্ছে না শিক্ষা বোর্ড। এই গুরুতর গাফিলতির কারণ খতিয়ে দেখতে এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে শিক্ষা বোর্ড থেকে ইতিমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটির সদস্যরা ঘটনাস্থল বগুড়ার শিবগঞ্জ সরকারি এমএইচ কলেজ কেন্দ্র সশরীরে পরিদর্শন করবেন এবং জড়িতদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবেন বলে জানা গেছে।
মন্তব্য