বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর পুনরায় কর আরোপের উদ্যোগ

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্র অনুযায়ী জানা গেছে, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অফশোর বা বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর পুনরায় ২০ শতাংশ হারে আয়কর আরোপ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। এই সংক্রান্ত একটি নতুন প্রস্তাবনা আগামী জুন মাসে জাতীয় সংসদে পেশ করা হতে যাওয়া অর্থবিলে অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে বলে বোর্ডের নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তারা আভাস দিয়েছেন। অফশোর ঋণ বলতে সাধারণত এমন একটি অর্থায়নের প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যেখানে কোনো দেশীয় ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান বিদেশি কোনো ঋণদাতার কাছ থেকে অফশোর ব্যাংকিং ইউনিটের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রায় তহবিল বা ঋণ সুবিধা গ্রহণ করে থাকে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কর কাঠামোর পরিবর্তন

বৈদেশিক ঋণের সুদের ওপর এই ২০ শতাংশ কর ব্যবস্থাটি সর্বপ্রথম ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে কার্যকর করা হয়েছিল। তবে সে সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের নানাবিধ আপত্তি ও তীব্র আর্থিক চাপের মুখে তৎকালীন সরকার এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের ২২ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড একটি সংবিধিবদ্ধ বিধিবদ্ধ আদেশ জারির মাধ্যমে এই কর সম্পূর্ণরূপে মওকুফ করে বিদেশি ঋণ গ্রহণের পথ সুগম করেছিল।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বাজেট প্রণয়ন কমিটির সাথে সরাসরি যুক্ত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন যে, এই কর পুনরায় আরোপের প্রস্তাবটি ইতিমধ্যে সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে সবুজ সংকেত বা আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছে। তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন যে, বিগত সময়ে যখন এই কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, তখন বাংলাদেশ তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বা রিজার্ভের সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ফলে দেশের বাজারে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ সচল ও বৃদ্ধি করার তাগিদে ওই ছাড় দেওয়া হয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও সমতার যুক্তি

দেশের খ্যাতনামা কর বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপকে একটি ইতিবাচক ও সমতাভিত্তিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ঋণের ক্ষেত্রে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কর কাঠামো বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া এই বিষয়ে বলেন, দেশের অভ্যন্তরে স্থানীয় ব্যাংক থেকে নেওয়া যেকোনো ঋণের সুদের ওপর কর ধার্য করা আছে, অথচ অফশোর ঋণের সুদের ওপর কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।

তিনি যুক্তি দেখান যে, অর্থনৈতিক সমতা ও ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে অফশোর ঋণের সুদের ওপর অবশ্যই কর পুনর্বহাল করা উচিত। অন্যথায় এটি দেশীয় অর্থায়ন ব্যবস্থার জন্য এক ধরণের বৈষম্য তৈরি করে। তাছাড়া বিশ্বের বহু দেশের সাথে বাংলাদেশের দ্বিমুখী কর পরিহার চুক্তি রয়েছে। এর ফলে বিদেশি ঋণদাতারা বাংলাদেশে যে কর পরিশোধ করবেন, তা তারা নিজ দেশে তাদের কর দায়ের সাথে খুব সহজেই সমন্বয় বা রেয়াত করে নিতে পারবেন।

শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যাংকিং খাতের আশঙ্কা

অন্যদিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পপতি এবং ব্যাংকাররা এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার জানান, এই কর ব্যবস্থা চালু হলে বিদেশি ব্যাংক ও অর্থলগ্নিকারী সংস্থাগুলো স্বাভাবিকভাবেই ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি করবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে দেশীয় শিল্পের ওপর এবং নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে। বর্তমানে ডিবিএল গ্রুপের প্রায় বিশ কোটি মার্কিন ডলার বা ২০০ মিলিয়ন ডলারের অফশোর ঋণ রয়েছে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমানও একই ধরণের উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই করের ফলে দেশের বাজারে বিদেশি তহবিলের জোগান বা প্রাপ্যতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেতে পারে। তিনি মনে করেন, করের বোঝা বাড়লে বিদেশি সংস্থাসমূহ ঋণ দিতে অনীহা প্রকাশ করবে, যা বেসরকারি খাতের জন্য ক্ষতিকর হবে।

নিচে অফশোর ঋণের ওপর প্রস্তাবিত কর সংক্রান্ত তথ্যের একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণী টেবিলের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

বিষয় বা ইভেন্টের বিবরণসুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক তথ্য ও উপাত্ত
প্রস্তাবিত পুনঃআরোপিত করের হার২০ শতাংশ (সুদের পরিমাণের ওপর)
প্রস্তাবনা পেশের সম্ভাব্য মাধ্যমআগামী জুন মাসের অর্থবিল
কর প্রথম চালুর সময়কাল২০২৩-২৪ অর্থবছর
কর প্রত্যাহারের সুনির্দিষ্ট মাধ্যম ও তারিখসংবিধিবদ্ধ বিধিবদ্ধ আদেশ (২২ এপ্রিল ২০২৪)
ডিবিএল গ্রুপের মোট অফশোর ঋণপ্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
কর আরোপের মূল অর্থনৈতিক লক্ষ্যদেশীয় ও আন্তর্জাতিক ঋণের কর ব্যবস্থায় সমতা আনা

ব্যবসায়িক খাতের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন যে, দেশের অভ্যন্তরে উচ্চ সুদের হারের কারণে যেখানে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় এমনিতেই ঊর্ধ্বমুখী, সেখানে অফশোর ঋণের ওপর এই নতুন কর আরোপের সিদ্ধান্ত বেসরকারি খাতের বৈদেশিক অর্থায়নকে আরও বেশি ব্যয়বহুল ও সংকুচিত করে তুলবে।