লাকসামে শিশু নির্যাতন, ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় প্রভাবশালীরা

কুমিল্লার লাকসাম উপজেলায় ছয় বছর বয়সী এক কন্যাসন্তানকে যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে এক বৃদ্ধের বিরুদ্ধে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি এই ঘটনাটিকে সামাজিকভাবে মীমাংসা করার নামে পুরোপুরি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

ঘটনার বিবরণ ও ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য

গত শনিবার দুপুরে লাকসাম উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম আবদুল রশিদ, যাঁর বয়স আনুমানিক ৭০ বছর। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত ওই বৃদ্ধ এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন।

স্থানীয় অন্তত পাঁচজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। ঘটনার দিন শনিবার দুপুরে শিশুটির মা ও বাবা দুজনেই নিজেদের দৈনন্দিন কাজে ঘরের বাইরে ছিলেন। সেই সুযোগে জনমানবহীন ঘরে ঢুকে শিশুটিকে একা পেয়ে যৌন নিপীড়ন করেন আবদুল রশিদ। ওই সময় আকস্মিকভাবে শিশুটির মা ঘরে প্রবেশ করলে অভিযুক্ত রশিদ দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে যান।

এই বিষয়ে শিশুটির মা মুঠোফোনে জানান, দুপুরে কাজ শেষে ঘরে ফিরে তিনি দেখতে পান ওই বৃদ্ধ তাঁর মেয়ের সঙ্গে আপত্তিকর বা খারাপ কাজের চেষ্টা করছে। শিশুটির বাবা জানান, এলাকার প্রভাবশালী লোকজন বিষয়টি সামাজিকভাবে বিচার করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন, তাই তিনি আর নতুন করে আইনি ঝামেলা বা মামলা করতে চান না। একই গ্রামে বসবাস করার কারণে গ্রামীণ সমাজের বাইরে যাওয়া তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নিচে ঘটনার প্রধান চরিত্র, অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি ছকের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:

ঘটনার বিবরণ ও সূচকসংশ্লিষ্ট তথ্য ও বিবরণ
ভুক্তভোগীর বয়স ও পারিবারিক অবস্থা৬ বছর, অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার
অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম ও বয়সআবদুল রশিদ, ৭০ বছর
ঘটনার স্থান ও সময়লাকসাম উপজেলার একটি গ্রাম, শনিবার দুপুর
চিকিৎসাগত পরামর্শকুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার (ওসিসি)
বর্তমান পরিস্থিতিঅভিযুক্ত পলাতক, রাজনৈতিকভাবে মীমাংসার চেষ্টা

চিকিৎসা ও ওসিসিতে না নেওয়ার প্রেক্ষাপট

ঘটনার পর শনিবার সন্ধ্যায় শিশুটিকে চিকিৎসার জন্য লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। এরপর উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আইনি সুরক্ষার স্বার্থে শিশুটিকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তির পরামর্শ দেন। কিন্তু স্থানীয় প্রভাব ও পরিবারের অনীহার কারণে শিশুটিকে সেখানে নেওয়া হয়নি। চিকিৎসকের পরামর্শ উপেক্ষা করে পরিবারটি শিশুটিকে লাকসাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পুনরায় নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

রাজনৈতিক প্রভাব ও ধামাচাপার চেষ্টা

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, ঘটনার পর থেকেই রশিদের পক্ষাবলম্বন করে স্থানীয় ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি এবং ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদকসহ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিষয়টি মীমাংসা করার জন্য জোরালো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা ভুক্তভোগী পরিবারটিকে থানায় যেতে নিষেধ করছেন এবং আশ্বাস দিচ্ছেন যে তাঁরা নিজেরাই এর সঠিক বিচার করবেন। যদি তাঁরা বিচার করতে ব্যর্থ হন, তবেই পরিবারটিকে থানায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের কাছে আসা একটি ভিডিও চিত্রেও ওই রাজনৈতিক নেতাদের ভুক্তভোগীর পরিবারকে ঘরে বসে মীমাংসা করার আশ্বাস দিতে দেখা গেছে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি মো. এমদাদ হোসেন জানান, ঘটনার খবর পেয়েই তাঁরা ঘটনাস্থলে এসে যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন এবং শিশুটিকে হাসপাতালে পাঠিয়েছেন। চিকিৎসকের বরাতে তিনি দাবি করেন, শিশুটির সঙ্গে বড় ধরনের কিছু হয়নি, কেবল হাতের মধ্যে একটি কামড়ের দাগ রয়েছে। তাঁরা পরিবারটিকে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়েছেন এবং পরিবারটিও তাঁদের কথায় একমত পোষণ করেছে।

পুলিশের তৎপরতা ও আইনি অবস্থান

লাকসাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী কামরুন্নাহার লাইলি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে শিশুটির ওপর পাশবিক বা অনৈতিক নির্যাতনের চেষ্টা করা হয়েছে। ঘটনার বিস্তারিত জানার পরপরই পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি ঘটনার পর থেকেই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করায় তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা সম্ভব হয়নি। পুলিশ জড়িত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে এবং ভুক্তভোগী পরিবারটিকে থানায় এসে লিখিতভাবে মামলা দায়ের করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।