কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরস্পরবিরোধী আর্থিক নীতি ও বাজারের অনিশ্চয়তা

বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি পুনর্গঠনে বহুমুখী সংকটের বিরুদ্ধে কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, মন্দাক্রান্ত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানকে নীতিগত ছাড় দেওয়া এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ সচল করা। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী বা একে অপরের পরিপন্থী। এর ফলে দেশের আর্থিক বাজারে একটি বিভ্রান্তিকর সংকেত বা বার্তা পৌঁছাচ্ছে, যা চলমান অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাকে আরও ঘনীভূত করে তুলছে।

সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চালচিত্র ও ত্রিমুখী সংকট

বিগত তিন বছর ধরে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে তীব্র চাপ ছিল, প্রবাসী আয়ের শক্তিশালী প্রবাহ এবং আমদানির রাশ টেনে ধরার কারণে তা বর্তমানে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ স্তরে অবস্থান করছে, যার ফলে সাধারণ ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনই উচ্চ সুদের হারের কারণে নতুন বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতির প্রভাবে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তর অর্থাৎ প্রায় ৪ দশমিক ৭ শতাংশে এসে ঠেকেছে।

নিচে বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান বহুমুখী লক্ষ্য এবং সেগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিগত দ্বন্দ্বের একটি তুলনামূলক ছক তুলে ধরা হলো:

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি বা পদক্ষেপমূল প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্যএর ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ নীতিগত দ্বন্দ্ব
খোলা বাজার থেকে ডলার ক্রয়বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ।বাজারে স্থানীয় টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি বিরোধী নীতিকে দুর্বল করে।
ঋণ পুনর্নির্ধারণ সুবিধা শিথিলকরণমন্দাক্রান্ত শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে কিস্তি পরিশোধে সাময়িক ছাড়।ব্যাংকিং খাতের ঋণ আদায় ব্যাহত করে এবং খেলাপি ঋণের সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয়।
সুদের হার বৃদ্ধি ও বন্ডের মুনাফাঅতিরিক্ত তারল্য সংকুচিত করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা।ব্যাংকগুলোকে উৎপাদনশীল খাতে ঋণ দিতে নিরুৎসাহিত করে।

রিজার্ভ পুনর্গঠনের চেষ্টা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দ্বিধা

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নিয়মিত ডলার ক্রয়ের নীতিটি অর্থনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মুদ্রা বাজারের নিয়ম অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বাজার থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার কেনে, তখন তার বিপরীতে বাজারে সমপরিমাণ স্থানীয় মুদ্রা বা টাকা ছাড়তে হয়। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যের প্রবাহ বৃদ্ধি পায়, যা দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে আরও উসকে দিতে পারে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ডক্টর ফাহমিদা খাতুন জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূলত রিজার্ভের অবস্থান মজবুত করতে এবং বিনিময় হারের অতিরিক্ত ওঠানামা ঠেকাতে এই পদক্ষেপ নিচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী উল্লেখ করেন, উৎসবের আগে প্রবাসী আয়ের বড় প্রবাহের কারণে বাজারে ডলারের দাম হুট করে কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। টাকার মান দ্রুত শক্তিশালী হলে প্রবাসীরা আবার হুন্ডি বা অবৈধ চ্যানেলের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন, যা ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার তুলে নিচ্ছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা এই ব্যবস্থার গুরুতর ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বাজার থেকে ডলার কেনার পর যদি সেই অতিরিক্ত টাকা সরকারি সিকিউরিটিজ বা বন্ডের মাধ্যমে বাজার থেকে তুলে নেওয়া না হয়, তবে এই বাড়তি তারল্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে। এছাড়া প্রবাসীদের সুবিধা দিতে গিয়ে টাকার মান অতিরিক্ত কমিয়ে দিলে আমদানি ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যায়। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি, খাদ্য, সার এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই দুর্বল টাকা সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ায় এবং ব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা নষ্ট করে।

ঋণ পুনর্নির্ধারণ বনাম ব্যাংকিং খাতের আর্থিক শৃঙ্খলা

উচ্চ সুদের হার এবং মন্দা পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো প্রায়শই ঋণ পরিশোধের শর্ত শিথিল বা ঋণ পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের মতে, বারবার এই ধরনের সুযোগ দেওয়ার ফলে ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি শিথিলতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যা আর্থিক শৃঙ্খলাকে চরমভাবে ভেঙে ফেলছে। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি।

মুহাম্মদ এ (রুমী) আলী প্রশ্ন তোলেন যে, যেসব প্রতিষ্ঠানকে বারবার ঋণ পুনর্নির্ধারণের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তারা আসলেই ভবিষ্যতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সক্ষম কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে না। ঋণ পুনর্নির্ধারণ মূলত প্রকৃত সমস্যা সমাধান না করে ঋণ পরিশোধের সময়কে সাময়িকভাবে পিছিয়ে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে এই সমস্ত ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানের নতুন পুঁজি বা কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন হয়, যা না করে কেবল ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দিলে ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি আরও বাড়ে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ডক্টর মুস্তফা কে মুজেরী এই বারবার ঋণ পুনর্নির্ধারণের বিষয়টিকে একটি ‘বাজে সংস্কৃতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এই বিষয়ে কঠোর হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

বেসরকারি ঋণপ্রবাহের পতন ও উৎপাদনশীল খাতের ভবিষ্যৎ

আর্থিক খাতের বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো বেসরকারি খাতে ঋণ বিতরণের ধীর গতি বা পতন। ব্যাংকগুলো এখন প্রকৃত অর্থনীতি বা উৎপাদনশীল শিল্প খাতে ঋণ দেওয়ার চেয়ে ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ করতে বেশি নিরাপদ বোধ করছে, কারণ সেখানে মুনাফা বা রিটার্ন অনেক বেশি এবং কোনো ধরনের ঝুঁকি নেই। এর ফলে ব্যাংকিং সিস্টেমে টাকা থাকা সত্ত্বেও ছোট ও মাঝারি উৎপাদনশীল শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এবং উৎপাদনশীল খাতের জন্য কম সুদে বিশেষায়িত পুনরর্থায়ন তহবিল বা বিশেষ ঋণ স্কিম চালু করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সামষ্টিক অর্থনীতির এই সংকটকালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে এবং আর্থিক খাতের অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে কেবল নীতিগত পরিবর্তন করে বাজারের দীর্ঘমেয়াদি আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।