ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ড আজও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও রহস্যঘেরা ঘটনা। তিন দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে—শুধুই কি এলটিটিই এই হত্যার নেপথ্যে ছিল, নাকি আরও কোনো অদৃশ্য শক্তি পর্দার আড়ালে কলকাঠি নেড়েছিল?
সময়ে সময়ে ভারতের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই হত্যাকাণ্ডে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের সম্ভাব্য ভূমিকার ইঙ্গিত দিয়েছেন। আবার অনেকে মনে করেন, বোফর্স কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে ভারতের ক্ষমতাকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই কারণে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ কিংবা সুবিধাভোগী কোনো মহলও সন্দেহের বাইরে নয়।
তবে আদালতের বিচারে শেষ পর্যন্ত দায়ী করা হয় শ্রীলঙ্কার তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন লিবারেশন টাইগার্স অফ তামিল ইলম-কে।
সিআইএর আগাম সতর্কবার্তা
ঘটনার আরও বিস্ময়কর দিক হলো—রাজীব গান্ধী হত্যার প্রায় পাঁচ বছর আগেই মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সম্ভাব্য এমন এক হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা করেছিল।
১৯৮৬ সালে তারা রাজীব-পোস্ট ইন্ডিয়া…” শিরোনামে ২৩ পৃষ্ঠার একটি গোপন প্রতিবেদন তৈরি করে ভারতীয় উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে পাঠায়। প্রতিবেদনের বেশ কিছু অংশ পরে মুছে ফেলা হলেও শুরুতেই উল্লেখ ছিল—১৯৮৯ সালে ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই রাজীব গান্ধী আততায়ীর হামলার শিকার হতে পারেন।
সেখানে তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল শিখ উগ্রবাদী ও কাশ্মীরি মুসলিম বিচ্ছিন্নতাবাদীদের। যদিও প্রতিবেদনের গোপন অংশে এলটিটিই সম্পর্কে কোনো সতর্কবার্তা ছিল কি না, তা আজও স্পষ্ট নয়।
কেন টার্গেটে পরিণত হন রাজীব?
১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে রাজীব গান্ধী শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেন এবং ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী (IPKF) পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল তামিল বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আনা। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ফলে এলটিটিইর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক চরম বৈরিতায় রূপ নেয়।
১৯৮৯ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পরও রাজীব ঘোষণা দিয়েছিলেন, পুনরায় ক্ষমতায় এলে তিনি আবারও শ্রীলঙ্কায় ভারতীয় বাহিনী পাঠাবেন এবং তামিল বিদ্রোহ দমন করবেন।
এমন ঘোষণাকেই নিজেদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিলেন এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণ। ধারণা করা হয়, তাঁর নির্দেশেই রাজীব গান্ধীকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
সেই ভয়াল ২১ মে
১৯৯১ সালের ২১ মে। ভারতের তামিলনাড়ুর শ্রীপেরামবুদুরে নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিতে যান রাজীব গান্ধী। জনতার ভিড়ের মধ্যে এক নারী তাঁর কাছে এগিয়ে আসে। সম্মান প্রদর্শনের ভান করে পায়ে স্পর্শ করার মুহূর্তেই শরীরে বাঁধা বিস্ফোরক ডিভাইসের বিস্ফোরণ ঘটায় সে।
ভয়াবহ সেই আত্মঘাতী হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন রাজীব গান্ধী সহ আরও ১৭ জন।
পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে, হামলাকারী নারী এলটিটিইর সদস্য ছিল। এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ২১ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে নলিনী, মুরুগান, শান্তন ও রবার্ট পিওসের মৃত্যুদণ্ড হলেও পরে তা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
ইতিহাসের এক অসমাপ্ত প্রশ্ন
ভারতের আদালত এলটিটিইকেই দায়ী করলেও বহু মানুষের মনে এখনো প্রশ্ন রয়ে গেছে—একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন কি একাই এমন আন্তর্জাতিক মাত্রার হত্যাকাণ্ড ঘটাতে সক্ষম ছিল? নাকি এর পেছনে ছিল আরও বড় কোনো ভূরাজনৈতিক খেলা?
সেই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর হয়তো ইতিহাসের কাছেই রয়ে যাবে।
জন্ম : ২০ আগস্ট ১৯৪৪
মৃত্যু : ২১ মে ১৯৯১
শ্রদ্ধাঞ্জলি।
