আগামী মুদ্রানীতি ঘোষণার প্রাক্কালে নীতি সুদহার (পলিসি রেট) কমানো বা বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র নীতিগত মতভেদ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতির ওপর সুদের হারের প্রভাব মূল্যায়ন করতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিনির্ধারকেরা ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। এই দ্বিমুখী অবস্থানের প্রেক্ষাপটে, গত ২০ মে, ২০২৬ তারিখে গভর্নরের সভাপতিত্বে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় ব্যাংকের সকল ডেপুটি গভর্নর, নির্বাহী পরিচালক এবং পরিচালকগণ অংশ নেন।
নীতি সুদহার নিয়ে কর্মকর্তাদের ভিন্নমত
সাম্প্রতিক সময়ে নীতি সুদহার বৃদ্ধির ফলে দেশের সামগ্রিক ব্যাংক ঋণের হার উচ্চপর্যায়ে রয়েছে, যা নিয়ে ব্যবসায়ী মহল থেকে ক্রমাগত আপত্তি জানানো হচ্ছে। ২০ মে-র বৈঠকে একদল কর্মকর্তা যুক্তি দেন যে, বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি সচল করতে এবং কর্মসংস্থান বাড়াতে অবিলম্বে সুদের হার কমানো উচিত। অন্যথায় উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এর বিপরীতে, অপর পক্ষটি এখনই সুদহার কমানোর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। তারা ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বহাল থাকা ঐতিহাসিক ‘৯-৬ সুদহার’ ব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে সময় সুদের হারের ওপর কৃত্রিম সীমা আরোপ করা হলেও তা আশানুরূপ বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, কেবল সুদের হার হ্রাস করলেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়।
সভায় ডেপুটি গভর্নর জাকির হোসেন চৌধুরী উল্লেখ করেন, স্থানীয় প্রেক্ষাপটে সুদের হারের সাথে মূল্যস্ফীতি এবং বিনিয়োগের সরাসরি সম্পর্ক খুব বেশি জোরালো নয়। দেশের মানুষ সাধারণত পণ্যমূল্য বৃদ্ধির বিপরীতে ঋণ গ্রহণ করে না। বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণে অনেক সময় মূল্যস্ফীতি ঘটে, আবার ভালো কৃষি উৎপাদন মূল্যস্ফীতি হ্রাসে সহায়তা করে। অন্য এক ডেপুটি গভর্নর মোঃ কবির আহমদ যোগ করেন, প্রথাগত অর্থনৈতিক মডেল সবসময় বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করে না। তাই নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।
ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও মুদ্রানীতির লক্ষ্যমাত্রা
বৈঠকে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোর মুনাফা বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়েও আলোচনা হয়। দুর্বল ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থা সংকটের কারণে আমানতকারীরা তাদের অর্থ সবল ব্যাংকগুলোতে স্থানান্তর করছেন। এর ফলে সবল ব্যাংকগুলো কম সুদে আমানত সংগ্রহ করতে পারলেও ঋণের ক্ষেত্রে চড়া সুদের হার বজায় রাখছে, যা তাদের ‘ইন্টারেস্ট স্প্রেড’ বা সুদের ব্যবধানকে অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘ আলোচনার পরও নীতি সুদহার বৃদ্ধির বা হ্রাসের বিষয়ে সভায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
নিচে বর্তমান মুদ্রানীতির প্রধান লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রকৃত অর্জনের একটি পরিসংখ্যানগত ছক দেওয়া হলো:
| অর্থনৈতিক সূচক | নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা | অর্জিত হার ও প্রক্ষেপণ | বর্তমান অবস্থা ও প্রেক্ষাপট |
| বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি | ৮.৫০% | ৪.২৭% (মার্চের তথ্য) | দেশের ইতিহাসে অন্যতম সর্বনিম্ন স্তর |
| মূল্যস্ফীতি (Inflation) | ৭.০০% | — | নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্য |
| জিডিপি (GDP) প্রবৃদ্ধি | ৫.০০% | — | আগামী মেয়াদের জন্য প্রক্ষেপিত হার |
মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮.৫০ শতাংশ ধরা হলেও গত মার্চ মাসে তা রেকর্ড হ্রাস পেয়ে মাত্র ৪.২৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বর্তমানে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি ও ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখে তাদের পরবর্তী মুদ্রানীতির রূপরেখা চূড়ান্ত করার কাজ করছে।
